কওমী মাদ্রাসা সনদ স্বীকৃতি প্রসঙ্গঃ (পর্ব-২)


পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনাঃ
এক সময় দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসার দাওরা ডিগ্রিধারীগণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে গেষ্ট টিচার হিসাবে পাঠ দান করেছেন।

তাদের মাঝে রয়েছেন মাওলানা যফর আহমাদ উসমানী, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক এবং সম্ভবত মাওলানা রেজাউল কারীম ইসলামাবাদী। সেখানে এ প্রশ্ন ওঠেনি তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাতিষ্ঠানিক কোন সার্টিফিকেট নেই। না অনার্সের, না মাস্টার্স-এর। তাঁরা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিভাগে অনার্স ও এম এ-র ক্লাশ নেবেন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ তখন শিক্ষা ও শিক্ষককে মূল্যায়ন করেছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় কি দেওবন্দ, কি দেশের কোন কাওমী মাদরাসার দাওরা ডিগ্রিধারীগণ সরকারী মাদরাসার ফাযিল ও পরবর্তিতে কামিল সমমান ধরে সরকারী আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করার সুযোগ পেতেন। এদের সংখ্যা প্রচুর ছিল। এখন অবশ্য এ ধারা অব্যাহত নেই।

খতীব মাওলান উবাইদুল হক যিনি ছিলেন ঢাকা আলীয়া মাদরাসার হেড মুহাদ্দিস। পরবর্তিতে আজীবন তিনি জাতীয় মাসজিদ বাইতুল মুকাররামের খতিবের দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। শুধু তাই নয়, ক্রান্তিকালে মুসলিম উম্মাহকে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন।

জাতীয় অঙ্গনে উন্নত মমশীর মাওলনা আতহার আলী, খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দীক আহমাদ, সদর সাহেব মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, বাংলাদেশের তাওবার রাজনীতি প্রবর্তনকারী এবং প্রেসিডেন্ট নিবার্চনে অংশগ্রহণকারী হাফেজ্জী হুজুর মাওলানা মুহাম্মাদ উল্লাহ, শাইখুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক এবং মুফতী ফজলুল হক আমীনী (সাবেক এম পি), মাওলানা আতাউর রহমান খান (সাবেক এম পি) রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখের অবদান কেউ কী অস্বীকার করতে পারবেন? তাঁরা সবাই ছিলেন কওমী ঘরানার।

আরও আগে শাইখুল ইসলাম মাওলানা হোসাইন আহমাদ মাদানী, চৈন্তিক জগতে আরব ও আজমের উস্তায, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব আবুল হাসান আলী নাদাভী (আলী মিয়া) মাওলানা মানযুর নোমানী, মাওলানা শিব্বির আহমাদ উসমানী, পাকিস্তানের মুফতিয়ে আযম মুফতী মুহাম্মাদ শফী, মাওলানা যফর আহমাদ উসমানী, সিন্দ প্রদেশের মূখ্য মন্ত্রির দায়িত্ব পালনকারী মুফতী মাহমূদ, মাওলানা গোলাম গাউস হাজারী, মাওলানা ইহতিশামুল হক থানবী প্রমুখ রাহিমাহুমুল্লাহ এবং বর্তমানে মাওলানা ফজলুর রাহমান, পাকিস্তান বেফাকের সদর মাওলানা সালিমুল্লাহ খান, পাকিস্তানের বর্তমান মুফতিয়ে আযম মাওলানা রাফী উসমানী এবং এক সময়ের শরীয়া আদালতের (পাকিস্তান) প্রধান বিচারপতি, আন্তর্জাতিক ফিকহ কাউন্সিলের সদস্য, ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব মুফতী তাকী উসমানী প্রমুখরাও ছিলেন কওমী মাদরাসার ডিগ্রিধারী। তালিকা অনেক দীর্ঘ।

একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সন্মানীত ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. ইসহাকের নিকট দেওবন্দের দাওরা ডিগ্রির মান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি লিখেছিলেন, (যতটুকু মনে পড়ে মর্মার্থ) ‘দাওরা ডিগ্রি এম এ ডিগ্রির চাইতেও অনেক উর্ধ্বে’।

প্রস্তাবনা:

মাননীয় সরকার কাওমী সনদের স্বীকৃতি দিতে আন্তরিক বলেই মনে হয়। ইতঃমধ্যে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী এ স্বীকৃতি প্রদানে বিলম্বের কারণ হিসেবে একাধিক বোর্ডের কথা উল্লেখ করেছেন এবং সবাইকে একটি বোর্ডের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হতে বলেছেন।
পাশাপাশি দ্রুত কাওমী মাদরাসা উপযোগী কারিকুলাম প্রস্তুত করার নির্দেশও দিয়েছেন। সম্প্রতি এ সম্পর্কিত একটি সরকারী প্রজ্ঞাপনও জারী করা হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি মহোদয় কতৃক কাওমী মাদরাসার জন্য সিলেবাস প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে। তাই কাওমী সনদের স্বীকৃতির ব্যপারে সুস্পষ্ট কিছু প্রস্তাবনা পেশ করছি।

এক. সরকার নিবার্হী ক্ষমতা বলে গেজেট আকারে প্রজ্ঞাপন জারীর মাধ্যমে স্বীকৃতির ঘোষণা দিতে পারেন।

দুই. ভারত ও পাকিস্তানের সমম্বিত নীতি অবলম্বনে দাওরা ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেয়া যেতে পারে।

তিন. ভারত ও পাকিস্তানের মত কাওমী মাদরাসাগুলোকে একক হোক বা বেফাকের মাধ্যমে তাদের একক স্বাধীনতা বহাল রাখতে হবে। তারা নিজেরাই তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখে শিক্ষা কারিকুলাম ও সিলেবাসের আধুনিকায়ন, যুগোপযুগীকরণ, সংশোধন সংযোজনের ক্ষমতা সংরক্ষণ করবেন।

চার. দাওরা ডিগ্রির মান হবে এ নিয়ে কিছু প্রস্তাব নজরে পড়েছে। কেউ বলেছেন মেট্রিক সমমান দেয়া হোক। আবার কেউ প্রস্তাব করেছেন উচ্চ মাধ্যমিক (এইচ এস সি) সমমান দেয়া হোক। সমস্যা হল এতে কাওমী মাদরাসার সবোর্ব্চ্চ ডিগ্রির কি নাম হবে? তাই মুনাসিব হলো দাওরা হাদীস হোক বা তাফসীর বা ফিকহ এগুলোর মান হবে এম এ ডিগ্রির। নুন্যতম মান তো বি এ (অনার্স) এর নিচে হবে না।

পাঁচ. জাতীয় ভিত্তিতে নিবার্চিত একাধিক বেফাকের (বোর্ড বা কমিশন) তত্ববধানে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় কৃতকাযর্করাই এ স্বীকৃতি পাবেন।

ছয়. এ সনদের আওতায় ডিগ্রিধারীগণকে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে (সরকারী ও বেসরকারী) অনার্স হলে আল কুরআন, আল হাদীস, দাওয়াহ, আল ফিকহ ও আরবী সাহিত্যে এম এ ও এম এ হলে এম ফিল কোর্সে ভর্তি এবং পরবর্তিতে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।

সাত. স্তর বিন্যাসে বেফাকের নিজস্ব স্তর থাকতে পারে। তবে সেখানে উচ্চ মাধ্যমিকের স্তর থাকলে তাদেরকে উম্মুক্ত প্রতিযোগীতার মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তবে এটা না করাটাই উত্তম হবে। কারণ ছাত্ররা তখন এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে এবং মাদরাসাগুলো ইমেজ সংকটে পড়তে পারে। যেমন বর্তমানে আলিয়া মাদরাসাগুলোর অবস্থা।

আট. বিভিন্ন কাওমী মাদরাসায় পরিচালিত তাখাস্সুসের (উচ্চতর গবেষণা) বিষয়টিকেও বিবেচনায় আনা যেতে পারে। এম ফিল মানোত্তীর্ণ হলে এগুলোকে এম ফিল মান দেয়া যায় কি না বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে ঢালাওভাবে এ ধরণের তাখাসসুস কোর্স পরিচালনা করা যাবে না। উল্লেখ্য নানাবিধ কারণে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উচ্চতর গবেষণা স্তরে এম ফিল ও পিএইচ.ডি ডিগ্রি দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়নি।

নয়. কর্মক্ষেত্র সংকুচিত না করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কর্মক্ষেত্র উম্মুক্ত করা যেতে পারে। জন প্রসাশনে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে দাওরা ডিগ্রিধারীদের জন্য বি সি এস ক্যাডারে প্রতিযোগিতার সুযোগ দিতে হবে। আমার বিশ্বাস এ সুযোগ পেলে কাওমী ছাত্ররা দেশ ও জাতির সেবায় তাদের সেরাটা দিতে পারবে।

দশ. সবশেষে দাওরা তথা কাওমী মাদরাসা সনদ স্বীকৃতি প্রাপ্তির জন্য একদল আলিম ভারত ও পাকিস্তান সফর করে সেখানের স্বীকৃতির ধরণ সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন এবং প্রস্তাবনা পেশ করতে পারেন।

কওমী মাদরাসার স্বকীয়তা ধ্বংস করে স্বীকৃতি কওমী ছাত্রদের জন্য কতটুকু ফলপ্রসু হবে বিষয়টি নিয়ে আকাবিরগনকে ভাবতে হবে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বর্তমান বেফাকুল মাদারিসের সভাপতি হযরত মাওলানা শাহ আহমাদ শফি এবং মাওলানা ফরিদুদ্দিন মাসউদসহ আকাবিরের কেউ কওমী মাদরাসার স্বাতন্ত্র ও স্বকীয়তা বিসর্জন দিয়ে স্বীকৃতি মেনে নেবেন না। আমরা জানি তাঁরা দু’জনসহ দেশের সন্মানীত আলিমগণ ভারত সরকারের স্বীকৃতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানকারী উস্তাযুল আরব ওয়াল আজম শাইখুল হাদীস মাওলানা হোসাইন আহমাদ মাদানী (রহ) এর রূহানী সন্তান ও অনুসারী।

আল্লাহ আমাদের মুরুব্বী ও আকাবিরগনকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার তাওফীক দান করুন।
এবং বৃহত্তম স্বার্থের দিকে লক্ষ্য রেখে সকলকে একি প্লাট ফর্মে আসার ব্যবস্হা করুক- আমিন।

সুত্রঃ আওয়ার ইসলাম২৪ এ প্রচারিত ড. হাফেজ এবি এম হিযবুল্লাহ সাহেবের একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে।


মন্তব্য ও শেয়ার করুন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র ও রেজাল্ট বাংলা ভাষায় করা হোক!

কওমী মাদ্রাসা সনদ স্বীকৃতি প্রসঙ্গঃ

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (ইত্তেহাদুল মাদারিস) মারকাজী পরীক্ষা-২০১৯ এর ফল প্রকাশ!