ক্বওমী শিক্ষকদের জীবন মান পরিবর্তন হবে?



শাইখ ছাঈদ কোদালাভী -

১৯৯৮ সালে চন্দনাইশ দারুল উলুম মাদরাসায় শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে কর্ম জীবন শুরু। ২০০ টাকা হিসাব ভাতা সহ সতেরশো টাকা বেতন। পরিচালক মহোদয়ের বেতন ছিলো দুই হাজার'। প্রায় দু'বছর এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলাম। যা পেতাম যাতায়াত, নাস্তাপানি, হাত খরচ, টুকিটাকিতে শেষ হয়ে যেত।

২০০০ সালের দিকে রাঙ্গুনীয়া সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদরাসায় যোগ দিলাম হিসাব বিভাগের ভাতা সহ পঁচিশ শ' টাকা বেতনে, পরিচালকের পরে ওটাই ছিলো মাদ্রাসার বিশজন শিক্ষকদের মধ্যে সবছেয়ে বড় স্কেল! চার বছর পর সৌদি আরবে এরাবিক ক্যালিওগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত তা বেড়ে তিন হাজারের কাছাকাছি হয়েছিল।  
আমার সে সময়ের সহকর্মি যারা এখনো খেদমতে আছেন তাদের সর্বোচ্চ বেতন সাত আট হাজার।

হাজার বারোশো টাকায় চাকরি করতে দেখেছি আমাদের আসাতিজায়ে কেরামদের। যার আবার অধিকাংশ বাকি। এখনো ক্বওমী শিক্ষকদের গড় বেতন ছয় সাত হাজারের বেশি নয়।
কি হয় এই অংকের টাকায়? এক বস্তা চালের দাম যখন তিন হাজার টাকা, তখন সাত হাজারে একটা সংসার কিভাবে চলে? ভাবতে অবাক লাগে!

হুজুররা আনলিমিটেড বাচ্চা কাচ্চা নেয়ার শরয়ী হুকুমে অভ্যস্ত। চার পাঁচ সন্তানের ভরন পোষণ,মা বাবা,স্ত্রি, ভাই বোনের দেখভাল এই অল্প বেতনে কি করে সম্ভব তা ভাবার সময় কারো আছে কি?

অনেকে বলেন হুজুরদের টাকায় বরকত আছে। কতো ভালো চলেন হুজুররা!! 
হ্যাঁ হুজুররা কতো ভালো চলেন তা তো দেখেছি। আমার এক সহ কর্মির ছেলের ছোট্ট একটা অপারেশনে মাত্র চল্লিশ হাজার টাকার জন্য মানুষের ধারে ধারে ঘুরতে দেখেছি।দেখেছি পঞ্চাশ বছর শিক্ষকতার পর সামান্য চিকিৎসা খরচের জন্য চাঁদা কালেক্ট করতে। দশ বছর চাকরি করে বিয়ের খরচ যোগাড় করতে না পেরে যৌতুক নিয়ে বিয়ে করতে। তবে এটা ঠিক, শত অভাবের মাঝেও হাঁসি মুখে, পরিচ্ছন্ন বদনে সবার মাঝে বিচরনের এক অদ্ভুৎ যোগ্যতা আছে ক্বওমী ওলামায়ে কেরামদের। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর, অসম্ভব করুণ।যা সহজে প্রকাশ করেনা।

মাদরাসায় উঁচু উঁচু ইমারত তৈরিতে টাকার অভাব হয়না। সব অভাব শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধিতে। বেতন বাড়ানোর সময় কতৃপক্ষের উজ্বল চেহরা মলিন হয়ে যায়। অথচ সবার আগে শিক্ষকদের জীবন মান, থাকা -খাওয়ার সুন্দর বন্দোবস্ত করা উচিৎ ছিলো। অথচ মাদরাসা গুলোতে সবচেয়ে অবহেলিত বিষয় শিক্ষকদের অধিকার। 

শিক্ষকদের বেতনের এক আজগুবি নাম দেয়া হয়েছে হাদিয়া!! তার মানে এটা নিয়ে যেনো কেউ জোর খাটাতে না পারে! কিন্তু যখন কোনো শিক্ষক দু' দিন অনুপস্থিত থাকেন তখন তার দুই দিনের মাইনে কাটার ব্যাপারে এটা বেতন হয়ে যায়।তখন আর হাদিয়া থাকেনা। সুতরাং এটা বেতনই, হাদিয়া নয়।এটা তার প্রাপ্য তার অধিকার। এটা ন্যায্য হওয়া চাই। যেখানে একজন প্রাইমারি শিক্ষকের বেতন বিশ থেকে পঁচিশ হাজার সেখানে একজন ক্বওমী সিনিয়র শিক্ষকের বেতন ছয় সাত হাজার! এটা শুধু অন্যায্য নয়; বরং অপমানজনক ও বটে।

অনেকে বলতে পারেন,ভালোই তো চলছে।কোনো অভিযোগ তো নেই। সমস্যা ও তো দেখা যায়না।
হ্যাঁ সমস্যা অনেক গভীরে। 
ক্বওমী শিক্ষকদের এই আর্থিক কাটামোর কারনে এখনো ক্বওমি শিক্ষা নিম্ন বিত্তের শিক্ষা হিসেবে রয়ে গেছে। এখানে উচ্চবিত্ত কিংবা উচ্চ মধ্যবিত্তের সন্তানরা আসছে না।কারন একজন অভিভাবক তার সন্তানের শিক্ষার পাশাপাশি তার ইহকালিন জিবন মানের চিন্তা ও করে থাকে। এই চিন্তাটা দোষের কিছু নয়। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি উন্নত জীবন ব্যবস্থার ধারনা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক বিষয় নয়। এই চিন্তাটায় কারো দুর্বল ঈমানের প্রশ্ন তোলা একধরনের গোড়ামি।একজন মানুষ ধার্মিক হলেই তাকে গরিব হতে হবে এই ধারনা মুর্খতা। সুতরাং এই চিন্তা থেকেই ক্বওমী মাদরাসা এখনো গণমানুষের প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বস্তরে সমাদৃত হতে পারেনি।

অপরদিকে এই মানহীন জিবন ব্যবস্হা ক্বওমি মাদরাসাকে মেধাশুন্য করে দিচ্ছে। হিসেব করে দেখুন কয়জন মেধাবি ক্বওমি ছাত্র শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিচ্ছে? বলা যায় খুবই কম সংখ্যক। হয় তারা জেনারেল লাইনে চলে যাচ্ছে,অথবা কিছুদিন খেদমত করে উন্নত জিবন ব্যবস্থার তাগিদে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হাজার হাজার মেধাবি আলেম বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত।এরা চাকরির অভাবে নয় বরং সবদিক কুলিয়ে উঠতে না পেরে দেশ ছেড়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে মান সম্পন্ন শিক্ষক শূণ্যতায় ভোগবে ক্বওমী মাদরাসা গুলো।
আমি জামেয়া পটিয়ার অবিসংবাদিত পরিচালক আল্লামা হারুন ইসলামাবাদি রহঃ কে বলতে শুনেছি, "ক্বওমি মাদরাসা কখনো অর্থাভাবে বা কারো ষঢ়যন্ত্রে বন্ধ হবেনা,যদি কখনো বন্ধ হয় তাহলে যোগ্য লোকের অভাবেই হবে। "
আর যোগ্য ও মেধাবিদের ধরে রাখতে হলে অবশ্যই তাদের থাকা,খাবার এবং আর্থিক দিক মান সম্পন্ন করতেই হবে। 

একজন ক্বওমী শিক্ষকের নুন্যতম বেতন পনেরো হাজার হওয়া উচিৎ।সিনিয়রদের বিশের উপরে।মনে রাখতে হবে উঁচু দালানের চেয়ে একজন ভালো শিক্ষক ক্বওমী মাদরাসার জন্য বেশী প্রয়োজন। 

লেখাটা পড়ে অনেকে খুলুচিয়তের ওয়াজ করবেন।ফুলুসের টানাপোড়েনে খুলুচিয়তের দুর্দশা দেখেছি অনেক।এটা রাসুল সঃ এর হাদিস ও বটে। সুতরাং বাস্তবতার নিরিখে লিল্লাহিয়াত খোঁজাই বুদ্ধিমানের কাজ। সব মিলিয়ে এখনই ভাবার সময়। পৃথিবী এগিয়েছে মানুষের মনস্তাত্বিক জগতের পরিবর্তন হয়েছে। তার সাথে সামঞ্জস্যতা রাখতে না পারলে পিছিয়ে পড়তে হবে নিশ্চিত।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র ও রেজাল্ট বাংলা ভাষায় করা হোক!

কওমী মাদ্রাসা সনদ স্বীকৃতি প্রসঙ্গঃ

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (ইত্তেহাদুল মাদারিস) মারকাজী পরীক্ষা-২০১৯ এর ফল প্রকাশ!