শিশুদের যেসব নাম রাখা হারাম ও মাকরুহ!

- শায়খ ছাঈদ কোদালাভী

শিশুর জন্মের পর তার জন্য একটি সুন্দর ইসলামী নাম রাখা প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার কর্তব্য। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের ন্যায় বাংলাদেশের মুসলমানদের মাঝেও ইসলামী সংস্কৃতি ও মুসলিম ঐতিহ্যের সাথে মিল রেখে শিশুর নাম নির্বাচন করার আগ্রহ দেখা যায়।
এজন্য তাঁরা নবজাতকের নাম নির্বাচনে পরিচিত আলেম-ওলামাদের শরণাপন্ন হন।

তবে সত্যি কথা বলতে কি এ বিষয়ে আমাদের পড়াশুনা অতি অপ্রতুল। তাই ইসলামী নাম রাখার আগ্রহ থাকার পরও অজ্ঞতাবশত আমরা এমনসব নাম নির্বাচন করে ফেলি যেগুলো আদৌ ইসলামী নামের আওতাভুক্ত নয়।
শব্দটি আরবী অথবা কুরআনের শব্দ হলেই নামটি ইসলামী হবে তাতো নয়। কুরআনে তো পৃথিবীর নিকৃষ্টতম কাফেরদের নাম উল্লেখ আছে। ইবলিস, ফেরাউন, হামান, কারুন, আবু লাহাব ইত্যাদি নাম তো কুরআনে উল্লেখ আছে; তাই বলে কী এসব নামে নাম রাখা সমীচীন হবে!? তাই এ বিষয়ে সঠিক নীতিমালা আমাদের জানা প্রয়োজন।

আমাদের দেশের কতিপয় মানুষ সন্তানের দূ'টি নাম রাখেন ১- ভালনাম ২- ডাকনাম যেমনঃ শাহ গরীব তকিমুল ইসলাম (দূর্জয়), মুহাম্মদ আকমল হোসেন (সুমন) এজাতীয় নাম রাখা উচিৎ নয়।
নাম হবে একটাই যা দ্বারা সন্তান কে ডাকবে, নামের আগে ও পিছনে টাইটেল বা লেজ লাগানো যা শুধু লেখার জন্য দেয়া হয় তা নাম নয়, নাম সংক্ষেপে হলে ভালো হয় যেন ডাকতে সহজ হয়।
নামের পিছনে "বিন" দিয়ে পিতার নাম যোগ করলে পরিচিতিতে সহজ হয় যেমনঃ মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ।

স্ত্রীর নামের পিছনে স্বামীর নাম লাগানো এটাও একটা অজ্ঞতা, ছেলেদের মতো মেয়েদের নামের পিছনেও বাবার নাম লিখবে যেমনঃ ফাতেমা বিনতে আব্দুল্লাহ, হ্যাঁ প্রয়োজন ক্ষেত্রে স্বামীর নাম লিখবে যেমনঃ ফাতেমা বিনতে আবদুল্লাহ স্বামীঃ ডঃ আবদুল আজিজ, সরাসরি ফাতেমা আজিজ এভাবে লিখবেনা।

সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে- “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় নাম হচ্ছে- আব্দুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা) ও আব্দুর রহমান (রহমানের বান্দা)।” এ নামদ্বয় আল্লাহর প্রিয় হওয়ার কারণ হল- এ নামদ্বয়ে আল্লাহর উপাসনার স্বীকৃতি রয়েছে। একই কারণে আল্লাহর অন্যান্য নামের সাথে আরবী ‘আব্দ’ (বান্দা) শব্দটিকে সমন্ধিত করে নাম রাখাও উত্তম।

ইসলামে যেসব নাম রাখা হারামঃ

আল্লাহর নাম নয় এমন কোন নামের সাথে গোলাম বা আব্দ (বান্দা) শব্দটিকে সম্বন্ধ করে নাম রাখা হারাম। যেমনঃ
আব্দুল মোত্তালিব (মোত্তালিবের দাস),
আব্দুল কালাম (কথার দাস)
আব্দুল কাবা (কাবাগৃহের দাস)
আব্দুন নবী (নবীর দাস)
গোলাম রসূল (রসূলের দাস)
গোলাম নবী (নবীর দাস)
আব্দুস শামছ (সূর্যের দাস)
আব্দুল কামার (চন্দ্রের দাস)
আব্দুল আলী (আলীর দাস)
আব্দুল হুসাইন (হোসাইনের দাস)
আব্দুল আমীর (গর্ভনরের দাস)
গোলাম মুহাম্মদ (মুহাম্মদের দাস)
গোলাম কাদের (কাদেরের দাস) ইত্যাদি।

অনুরূপভাবে যেসব নামকে কেউ কেউ আল্লাহর নাম মনে করে ভুল করেন অথচ সেগুলো আল্লাহর নাম নয় সেসব নামের সাথে আব্দ বা দাস শব্দকে সম্বন্ধিত করে নাম রাখাও হারাম।
যেমন-
আব্দুল মাবুদ (মাবুদ শব্দটি আল্লাহর নাম হিসেব কুরআন ও হাদীছে আসেনি, বরং আল্লাহর বিশেষণ হিসেবে এসেছে)
আব্দুল মাওজুদ (মাওজুদ শব্দটি আল্লহর নাম হিসেব কুরআন ও হাদীছে আসেনি) অনুরূপভাবেঃ
শাহেনশাহ, আলমগীর, জাহাঙ্গীর শাহ জাহান যার অর্থ (জগতের বাদশাহ) এসব নাম রাখাও হারাম কারন জগতের বাদশাহ শুধুমাত্র আল্লাহ। [মুসলিম]।

মালিকুল মুলক (রাজাধিরাজ) নাম রাখা হারাম।
সাইয়্যেদুন নাস (মানবজাতির নেতা) নাম রাখা হারাম। [তুহফাতুল মাওলুদ ১/১১৫]

সরাসরি আল্লাহর নামে নাম রাখা হারাম। যেমন-
আর-রাহমান, আর-রহীম, আল-আহাদ, আস-সামাদ, আল-খালেক, আর-রাজেক, আল- আওয়াল, আল-আখের ইত্যাদি।

যেসব নাম রাখা ওলামায়ে কেরামগন মাকরুহ বা অপছন্দ বলেছেনঃ
   
ক) যেসব নামের মধ্যে আত্মস্তুতি আছে সেসব নাম রাখা মাকরুহ। যেমন,
মুবারক (বরকতময়) যেন সে ব্যক্তি নিজে দাবী করছেন যে তিনি বরকতময়, হতে পারে প্রকৃত অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো।
অনুরূপভাবে বাররা (পূন্যবতী)।

খ) শয়তানের নামে নাম রাখা। যেমন- ইবলিস, ওয়ালহান, আজদা, খিনজিব, হাব্বাব ইত্যাদি।

গ) ফেরাউনদের নামে নাম রাখা। যেমন- ফেরাউন, হামান, কারুন, ওয়ালিদ।[তুহফাতুল মাওদুদ ১/১১৮]

ঘ) বিশুদ্ধ মতে ফেরেশতাদের নামে নাম রাখা মাকরুহ। যেমন- জিব্রাইল, মিকাইল, ইস্রাফিল।

ঙ) যে সকল নামের অর্থ মন্দ। মানুষ যে অর্থকে ঘৃণা করে এমন অর্থবোধক কোন নাম রাখা। যেমন, কালব (কুকুর) মুররা (তিক্ত) হারব (যুদ্ধ)।

চ) একদল আলেম কুরআন শরীফের নামে নাম রাখাকে অপছন্দ করেছেন। যেমন-
ত্বহা, ইয়াসীন, হামীম ইত্যাদি।তাসমিয়াতুল মাওলুদ-বকর আবু যায়দ ১/২৭

ছ) শায়খ বকর আবু যায়দের মতে রাসূল শব্দের সাথে কোন শব্দকে সম্বন্ধিত করে নাম রাখাও মাকরূহ। যেমন- গোলাম রাসূল (গোলাম শব্দটিকে যদি আরবী শব্দ হিসেবে ধরা হয় এর অর্থ হবে রাসূলের চাকর বা বাছা তখন এটি মাকরূহ। আর যেসব ভাষায় গোডলাম শব্দটি দাস অর্থে ব্যবহৃত হয় সেসব ভাষার শব্দ হিসেবে নাম রাখা হয় তখন এ ধরনের নাম রাখা হারাম যেমনঃ আব্দুর রাসুল যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।

হে আল্লাহ, আমাদের কে পরিপূর্ণভাবে তোমার দ্বীনকে বুঝার ও মানার তাওফীক দান করুন- আমিন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র ও রেজাল্ট বাংলা ভাষায় করা হোক!

কওমী মাদ্রাসা সনদ স্বীকৃতি প্রসঙ্গঃ

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (ইত্তেহাদুল মাদারিস) মারকাজী পরীক্ষা-২০১৯ এর ফল প্রকাশ!