রোজা রাখার ফজিলত
শাইখ ছাঈদ কোদালাভী
রোজা রাখার ফযিলত অগণিত। রোজা পালনকারীকে আল্লাহ নিজে যথার্থ পুরস্কার দেবেন। রোজা পালনকারীকে যেসব পুরস্কার ও প্রতিদান আল্লাহতায়ালা দেবেন তার কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করা হলো :১. আল্লাহ স্বয়ং নিজে রোজার প্রতিদান দেবেন। হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘‘মানুষের প্রতিটি ভাল কাজ নিজের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু রোজা শুধুমাত্র আমার জন্য, অতএব আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। (বুখারী)
২. রোজা অতি উত্তম নেক আমল। আবু হুরাইরাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র একটি হাদীসে তিনি বলেছিলেন, ‘‘হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে একটি অতি উত্তম নেক আমলের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি রোজা পালন কর। কেননা, এর সমমর্যাদা সম্পন্ন কোন আমল নেই।’’ (নাসাঈ)
অন্যান্য ইবাদত মানুষ দেখতে পায়। কিন্তু সিয়ামের মধ্যে তা নেই। লোক দেখানোর কোন আলামত সিয়াম পালনে থাকে না। শুধুই আল্লাহকে খুশী করার জন্য তা করা হয়। তাই এ ইবাদতের মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধ ইখলাস। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘‘সিয়াম পালনকারী শুধুমাত্র আমাকে খুশী করার জন্যই পানাহার ও যৌন উপভোগ পরিহার করে।’’
৩. জান্নাত লাভ সহজ হয়ে যাবে। সহীহ ইবনু হিববান কিতাবে আছে আবু উমামা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আবু উমামা রাদিআল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যার কারণে আমি জান্নাতে যেতে পারি। তিনি বললেন, তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর সমমর্যাদাসম্পন্ন কোন ইবাদাত নেই। (নাসাঈ)
৪. সিয়াম পালনকারীকে বিনা হিসেবে প্রতিদান দেয়া হয়। অন্যান্য ইবাদতের প্রতিদান আল্লাহতায়ালা তার দয়ার বদৌলতে ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু সিয়ামের প্রতিদান ও তার সাওয়াব এর চেয়েও বেহিসেবী সংখ্যা দিয়ে গুণ দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া হবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, ‘‘মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, কিন্তু সিয়ামের বিষয়টি ভিন্ন। কেননা সিয়াম শুধুমাত্র আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব।’’ (মুসলিম)
৫. জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সিয়াম ঢাল স্বরূপ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘সিয়াম ঢাল স্বরূপ। এ দ্বারা বান্দা তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পার।’’ (আহমাদ)
৬. জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য সিয়াম একটি মজবুত দুর্গ। হাদীসে আছে, ‘‘সিয়াম ঢালস্বরূপ এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার এক মজবুত দুর্গ।’’
৭. ইফতারের সময় বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। হাদীসে আছে, ইফতারের মুহূর্তে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। মুক্তির এ প্রক্রিয়াটি রমযানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে। (আহমাদ)
৮. সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশ্কের চেয়েও উত্তম (সুগন্ধিতে পরিণত হয়)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম'র জীবন সে সত্তার শপথ করে বলছি, সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহতায়ালার কাছে মিশকের ঘ্রাণের চেয়েও প্রিয় হয়ে যায়। (বুখারী ও মুসলিম)
৯. সিয়াম পালনকারীর জন্য রয়েছে দু'টি বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সিয়াম পালনকারীর জন্য দু'টো বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত রয়েছে : একটি হল ইফতারের সময়, আর দ্বিতীয়টি হলো তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। (বুখারী ও মুসলিম)
১০. সিয়াম কিয়ামাতের দিন সুপারিশ করবে। হাদীসে আছে, সিয়াম ও কুরআন কেয়ামতের দিন মানুষের জন্য এভাবে সুপারিশ করবে যে, সিয়াম বলবে হে আমার রব, আমি দিনের বেলায় তাকে (এ সিয়াম পালনকারীকে) পানাহার ও যৌনতা থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর। অনুরূপভাবে কুরআন বলবে, হে আমার রব, আমাকে অধ্যয়নরত থাকায় রাতের ঘুম থেকে আমি তাকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবুল কর। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবুল করা হবে। (আহমাদ)
১১. সিয়াম হল গুনাহের কাফফারা। আল্লাহতায়ালা বলেন, নিশ্চয়ই নেক আমল পাপরাশি দূর করে দেয়। (সূরা হুদ : ১১৪) । নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, পরিবার পরিজন, ধন-সম্পদ ও প্রতিবেশীদের নিয়ে জীবন চলার পথে যেসব গোনাহ মানুষের হয়ে যায় সালাত, সিয়াম ও দান খয়রাত সেসব গোনাহ মুছে ফেলে দেয়। (বুখারী ও মুসলিম)
১২. সিয়াম পালনকারীর এক রমযান থেকে পরবর্তী রমযানের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে যাওয়া ছগীরা গোনাহগুলোকে মাফ করে দেয়া হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘‘তোমরা যদি নিষিদ্ধ কবীরা গোনাহ থেকে বিরত থাক তাহলে তোমাদের ছগীরা গোনাহগুলোকে মুছে দেব এবং (জান্নাতে) তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। (সূরা নিসা : ৩১)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এর মধ্যবর্তী সময় ও এক জুমা থেকে অপর জুমা এবং এক রমযান থেকে অপর রমযান পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে হয়ে যাওয়া ছগীরা গোনাহগুলোকে (উল্লেখিত ইবাদতের) কাফ্ফারাস্বরূপ মুছে দেয়া হয় সে যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। (মুসলিম)
১৩. সিয়াম পালনকারীর পূর্বেকার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমযানে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম)
১৪. সিয়াম যৌন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে রাখে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের হেফাযতকারী। আর যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ্য রাখে না সে যেন সিয়াম পালন করে। কারণ এটা তার জন্য নিবৃতকারী। (অর্থাৎ সিয়াম পালন যৌন প্রবৃত্তি নিবৃত করে রাখে) (বুখারী ও মুসলিম)
১৫. সিয়াম পালনকারীরা রাইয়ান নামক মহিমান্বিত এক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। যার নাম রাইয়্যান। কেয়ামতের দিন শুধু সিয়াম পালনকারীরা ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।(বুখারী ও মুসলিম)
তাই আসুন, আমরা রোজা পালনের মাধ্যমে আমাদের গুনাহসমুহ মুছে ফেলি এবং মহান আল্লাহতালার সন্তুস্টি অর্জন করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের কে আজ হতে রমজানের সবকটি রোজা সঠিক নিয়মে পালন করার তৌফিক দান করুক - আমিন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন