ধর্মীয় শিক্ষায় কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসার অবদান!

শাইখ ছাঈদ কোদালাভী

কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসা" 
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া উপজেলার একটি পৌনে একশো 
!বছরের প্রাচীনতম দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
ইসলামী শিক্ষার প্রচার প্রসারে দীর্ঘদিন ধরেলোকবর্তিকা হিসেবে এগিয়ে চলছে চট্টলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলাধীন কোদালা ইউনিয়নের আল-মাদ্রাসাতুল আজিজিয়া কাসেমুল উলূম কোদালা ও এতিমখানা। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি চট্টগ্রাম সহ সারা দেশের মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি দ্বীনের প্রচার প্রসারে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে চলেছে। 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ঘেরা নিরিবিলি পরিবেশে মাদ্রাসাটিতে একদিকে এতিম শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণের দায়িত্ব ও অন্যদিকে অধ্যায়নকারীদের বিনা খরচে পরিপূর্ণ আধুনিক ও ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলা হয়। 
কেন্দ্রিয় কওমি মাদ্রাসা পটিয়া শিক্ষা বোর্ডের অধিনে এটি পরিচালিত হয়ে এবতেদায়ী, ছানোবীয়া, ছানোবীয়া হাচ্ছা, ডিগ্রী (স্নাতক) সমমান জামাতে উলা'র মারকাজী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা যুগ যুগ ধরে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ব্যাপক সুনাম অর্জন করে চলেছে। এভাবে পৌনে শত বছর ধরে মাদ্রাসাটি ধর্ম শিক্ষার বাতিঘর হিসেবে কোদালা ইউনিয়ন সহ সারা রাঙ্গুনিয়াকে আলোকিত করে চলেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আড়াই একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসা। এই জায়গায় মোট ৪টি ভবণ রয়েছে। এর মধ্যে ৩ তলা ২টি, ২ তলা ২টি, ১ তলা ভবন ও একটি সুবিশাল জামে মসজিদ রয়েছে। এখানে বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নরত প্রায় সাড়ে ৫’শত শিক্ষার্থীদের ৩২ জন শিক্ষকের মাধ্যমে পাঠদান করা হয়। এখানে হেফজ বিভাগ, নাজেরা বিভাগ, কিতাব বিভাগ সহ বিভিন্ন শ্রেণী শাখা ও বিভাগে জামাতে ওলা (স্নাতক) পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে মধ্যবিরতী দিয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা হয়। এছাড়াও মাগরিবের নামাজের পর থেকে রাত ১০টা ও ফজরের নামাজের পর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলে বিশেষ পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

মাদ্রাসার পরিচালক আলহাজ্ব, আল্লামা মুফতি আব্দুল কাদের সাহেব জানান, ‘১৯৩৩ সালে তৎকালীন পটিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মুফতি আজিজুল হক (রাহ:) এর নির্দেশে অলিকুল শিরুমনি আল্লামা শাহ মেহেরুজ্জামান (রাহ:) কোদালার নদী পাড়ে এটি প্রতিষ্ঠিত করেন। নদী ভাঙনের কারণে তৃতীয় বার স্থানান্তরিত হয়,
তৎকালিন চেয়ারম্যান কোদালার মেহনতি মানুষের পরম বন্ধু দ্বীনদরদী বিশিষ্ট দানবীর হাজী রহম আলী চেয়ারম্যান (রহ) এর আন্তরিক পদক্ষেপ ও বিরাট আর্থিক সহযোগীতায় বর্তমান অবস্থানে স্হানন্তরিত হয়ে বিরাট আকারে নির্মিত হয়েছে মাদ্রাসাটি। কিয়ামত পর্যন্ত এই মাদ্রাসার প্রতিটি বালু কণায় ও আলেম ওলামাদের হূদয়ে তার এই অবদানের কথা অবস্বরনীয় হয়ে থাকবেন, আল্লাহ তাআলা জনাব, হাজী রহম আলী চেয়ারম্যান কে জান্নাতের আলা মা'কাম দান করুক- আমিন।

মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা বিনা বেতনে আবাসিক ও অনাবাসিক ভাবে থেকে পড়ালেখা করছে। এবছর কেন্দ্রিয় বোর্ড পটিয়া মাদ্রাসার অধিনে এবতেদায়ীতে ২০ জন, ছাহনোবীয়াতে ১৫ জন, ছাহনোবীয়া হাচ্ছা পরীক্ষায় ১০ জন এবং উলা (ডিগ্রী) পরীক্ষায় ৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। 
অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাস সহ ১৩ জন পরীক্ষার্থী মমতাজ (গোল্ডেন এ+) পেয়েছে। এছাড়াও বোর্ডের পক্ষ থেকে ২০ জনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। এরমধ্যে এবছর মাদ্রাসার ৬ জন শিক্ষার্থী বিশেষ এই সম্মানে ভূষিত হয়। প্রতিবছর ৮০ লক্ষাধিক টাকা হিসেবে মাসে প্রায় ৭ লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয় এই মাদ্রাসা পরিচালনা করতে। যার সম্পূর্ণটাই আসে দেশ বিদেশের বিভিন্ন ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনসাধারণের দান-অনুদান, জাকাত, ফিতরা’র টাকা দিয়ে।

কথা হয় মাদরসায় অধ্যায়নরত এতিম শিক্ষার্থী আনছারুল্লাহ’র (১৩) সাথে। তার বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফে। ছোটবেলায় মা-বাবাকে হারিয়ে যখন অনিশ্চিত ছিল জীবনের সবকিছু। 
ঠিক তখন তার এলাকার এক হুজুরের মাধ্যমে ৫ বছর বয়সে সে এখানে এসেছিল। তখন থেকে কোদালা মাদ্রাসায় হয়ে ওঠে তার সবকিছু। তার মতো করে কুতুবদিয়া থেকে আব্দুল মান্নান (১৫), রাইখালীর খন্দকাটা গ্রাম থেকে আব্দুল আজিজ (১৫), মো. ইব্রাহীম (১৮) সবাই এখানে এতিম হিসেবে আশ্রয় নিয়ে থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা, পড়া সবকিছু পাচ্ছে। এরা সবাই মাদ্রাসার জামাতে পাঞ্জম (৬ষ্ঠ) শ্রেণির ছাত্র। তারা জানায়, তারাও বড় হয়ে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তাদের মতো অসহায়দের পাশে দাড়াতে এবং দোনিয়া-আখেরাতে মানুষের সুখ-শান্তির সঠিক রাস্তা দেখাতে চাই।’

মাদরাসায় কর্মরত শিক্ষক মাওলানা ওমর ফারুক জানান, ‘আনছারুল্লার মতো মাদ্রাসায় ১শত ৮০ জন এতিম শিক্ষার্থী রয়েছে। যাদের যাবতীয় ভরণ পোষণ সবকিছুই মাদ্রাসার পক্ষ থেকে করা হয়। এছাড়াও এরা সহ মাদ্রাসায় সাড়ে ৫’শত জন শিক্ষার্থী বিনা বেতনে এখানে পড়ালেখা করছে। ’
মাদ্রাসার অপর শিক্ষক মাওলানা আবুল বশর জানান, ‘ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। তখন থেকেই এখানে থেকে পড়ালেখা করে এখানেই শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছি। কোদালা মাদ্রাসা না থাকলে হয়তো আমার এই পর্যন্ত আসা হতো না।’

এখানকার হাজারো শিক্ষার্থী রয়েছে যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মসজিদ মাদ্রাসায় কর্মরত থেকে ধর্মীয় প্রচার প্রসারের পাশাপাশি বৈদেশিক প্রচুর রেমিটেন্স অর্জনের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে।

বর্তমান পরিচালক নিজেও এই মাদরাসার একজন গর্বিত শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ‘৩৭ বছর ধরে এই মাদ্রাসার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছি। এরমধ্যে ১৩ বছর পড়ালেখা করে মাঝের ৪ বছর পটিয়া মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস (এম এ ইসলামিক ষ্টাডিজ) ও ইসলামিক শরীয়াহ আইন বিভাগে পড়ালেখা শেষে পুনরায় কোদালা মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে শিক্ষা পরিচালক ও বর্তমানে প্রধান পরিচালক পদে দায়িত্বে পালন করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, ধর্মীয় এই প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় বর্তমানে যে অর্থের প্রয়োজন তা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। এর উপর প্রতিদিন নতুন নতুন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে নতুন শিক্ষাভবন নির্মাণ করা খুবই প্রয়োজন। এছাড়াও জরাজীর্ণ রান্নাঘর পুনরায় নির্মাণ করাও জরুরী।’ তিনি মাদরাসার উন্নয়নে ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনসাধারণের দোয়া ও সুদৃষ্টি কামনা করেন এবং তিনি আগামী ২৪ নভেম্বর'২০১৮ ইং রোজঃ শনিবারে অনুষ্ঠতব্য অত্রমাদ্রাসার বার্ষিক সভায় সকলকে আমন্ত্রন জানিয়েছেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র ও রেজাল্ট বাংলা ভাষায় করা হোক!

কওমী মাদ্রাসা সনদ স্বীকৃতি প্রসঙ্গঃ

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (ইত্তেহাদুল মাদারিস) মারকাজী পরীক্ষা-২০১৯ এর ফল প্রকাশ!