সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসা
বাংলার প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসা ও এতিমখানা-ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়-
#ভূমিকা
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি এবং কর্ণফুলী ও শিলক খালের পলিবাহিত উর্বর মৃত্তিকার তনয় হিসেবে সুপরিচিত চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা।
এই সুপ্রাচীন ও গৌরবদীপ্ত জনপদের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ কূল ঘেঁষে
পূর্ব সরফভাটায় গড়ে উঠেছে এক অনন্য দ্বীনি ইদারা সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসা ও এতিমখানা।
শান্ত, সুশীতল ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে ঘেরা এই প্রতিষ্ঠানটি সুদীর্ঘ একশতাব্দীর ও বেশি সময় ধরে সমগ্র বাংলায় ইসলামী শিক্ষা ও মানবতার আলো ছড়িয়ে আসছে।
এটি বাংলার ৪র্থ প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদ্রাসা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।
১. প্রতিষ্ঠা ও ঐতিহাসিক পটভূমি
বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাকেন্দ্র জামেয়া আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাত্র আট বছর পর, হিজরী ১৩১৭ মোতাবেক ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে এই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সে যুগে এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিশুদ্ধ দ্বীনি শিক্ষার অভাব দূর করা এবং সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত করার মহান লক্ষ্য নিয়ে এটি যাত্রা শুরু করে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানটি পবিত্র কুরআন ও হাদিসের অবিকৃত বাণী প্রচার এবং সুন্নাহর আলোকে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে এক দুর্ভেদ্য কেল্লা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। মাদ্রাসাটি আকিদাগতভাবে 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত' এবং আদর্শগতভাবে ভারতের 'দারুল উলুম দেওবন্দ'-এর পুণ্যময় নীতি অনুসরণ করে। এর সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম বিশ্বখ্যাত 'দারসে নিযামী' পাঠ্যক্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
২. প্রতিষ্ঠাতা বরেণ্য মনীষীবৃন্দ
দুইজন বিদগ্ধ আলেম ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের ঐকান্তিক সাধনা ও জ্ঞানতপস্যার ফসল হিসেবে এই মাদ্রাসাটি আত্মপ্রকাশ করে। তারা হলেন:
১. শাহ সুফি আল্লামা আব্দুল গনী বিন আব্দুল কাদের (রহ.) তিনি ভারতের বিখ্যাত বুজুর্গ আল্লামা শাহ ফজলুর রহমান গঞ্জে মুরাদাবাদী (রহ.)-এর অন্যতম বিশিষ্ট খলিফা এবং রাঙ্গুনিয়া মরিয়মনগরের কৃতি সন্তান।
২. আল্লামা ইসহাক বিন মিন্নত আলী (রহ.) তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের প্রখ্যাত শাইখুল হাদিস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী (রহ.)-এর সুযোগ্য শাগরিদ।
এই দুই মহান মনীষী দেওবন্দ থেকে উচ্চশিক্ষা সমাপন করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে দ্বীনের আলো ছড়াতে নিজেদের উৎসর্গ করে এই ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন।
৩. শিক্ষার স্তর ও বিভাগসমূহ
মাদ্রাসাটিতে আধুনিক চাহিদা ও দ্বীনি শিক্ষার এক চমৎকার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। পূর্বথেকে দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স) পর্যন্ত চালু থাকলেও ৯০এর দশকে তা বন্ধ হয়ে যায়, বর্তমানে এখানে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে স্নাতক ডিগ্রি (জামাআতে উলা) পর্যন্ত শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রধান বিভাগগুলোর মধ্যে নূরানী ও নাজেরা বিভাগ, হিফজুল কুরআন বিভাগ, কিতাব বিভাগ (উলা পর্যন্ত) এবং অন্যান্য কারিগরি ও সাহিত্য বিভাগ যেমন: আধুনিক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ইসলামি ক্যালিগ্রাফি ও হস্তলিপি প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশের জন্য 'আল মুয়াবিন সাহিত্য বিভাগ' অন্যতম।
৪. উল্যেখযোগ্য মাদ্রাসার কর্ণধার ও সংস্কারকগণের তালিকাঃ-
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম ও বুজুর্গগণ যারা এই মাদ্রাসার মোহতামিম (পরিচালক) ও সংস্কারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে একে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন তাদের মধ্য রয়েছেন-
১. শাহ সুফি আল্লামা ছমিউদ্দীন (রহ.) খলিফা, হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.), ভারত।
২. আল্লামা সুলতান আহমদ বিন হাজী নেয়ামত আলী (রহ.)
৩. কুতুবুল আলম আল্লামা শাহ মেহেরুজ্জামান বিন বরকত আলী (রহ.)
৪. আল্লামা শাইখ হারুন ইসমাঈল ইসলামাবাদী (রহ.)
৫. মাওলানা আবদুল কুদ্দুস কোদালাভী (রহ.)
৬. মাওলানা আমিরুজ্জামান (রহ.)(পদুয়া)
৭. আল্লামা শাহ মনির আহমদ (রহ.) প্রকাশ নায়েবে সাহেব হুজুর।
৮. আলহাজ্ব মাওলানা আবুল বয়ান সাহেব (রহ.)সংস্কারক ও পরিচালক।
৫. ইতিহাসের সাক্ষী: প্রসিদ্ধ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ
সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসা এমন এক পবিত্র শিক্ষালয় যার আঙিনায় শিক্ষক হিসেবে পা রেখেছেন বিশ্ববরেণ্য বুজুর্গানে দ্বীন এবং শিক্ষার্থী হিসেবে তৈরি হয়েছেন দেশ-বিদেশে খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ।
#প্রসিদ্ধ শিক্ষকবৃন্দ:
জামেয়া ইসলামিয়া পটিয়ার ইমাম আহমদ সাহেব (রহ.),
পটিয়ার আমির হোছাইন প্রকাশ মীর সাহেব হুজুর,
আওলাদে রাসুল (সা.) সৈয়দ আবদুল করিম এবং সৈয়দ হামযাহ বাগদাদী (রহ.)-এর মতো আরো অনেক মহান ব্যক্তিগণ এখানে শিক্ষকতা করেছেন।
**গর্বিত ছাত্রবৃন্দ:**
এই মাদ্রাসার ধূলিকণা মেখে বড় হয়েছেন হাটহাজারী মাদ্রাসার দীর্ঘকালীন স্বনামধন্য মোহতামিম শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি (রহ.)। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্বারী এবং রেডিও ও বিটিভির জাতীয় ক্বারী জনাব ক্বারী ওবায়দুল্লাহ (রহ.) ছিলেন এই মাদ্রাসারই ছাত্র। এছাড়া ঢাকা লালবাগ মাদ্রাসার বিশিষ্ট মুহাদ্দিস বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব আল্লামা মুফতি ফয়েজ উল্লাহ, এবং অত্র মাদরাসার সাবেক মোহতামিম আলহাজ্ব মাওলানা আবুল বয়ান (রহ.) ও বর্তমান মোহতামিম মাওঃ জালাল আহমদ সাহেবসহ বহু দেশবরেণ্য ওলামায়ে কেরাম এই প্রতিষ্ঠানের গর্বিত ছাত্র।
৬. লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও উন্নয়ন কার্যক্রমঃ--
বিশুদ্ধ আক্বিদা বিশ্বাস ও ইসলামি মূল্যবোধ সংরক্ষণ, তাওহীদ ও সুন্নাতে রাসুলের (সা.) পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ এবং মহান আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক মজবুত করাই এই মাদ্রাসার মূল লক্ষ্য।
মাদরাসা পরিচালনা কমিটি ও এলাকার ধর্মপ্রাণ ও কোরআনপ্রেমী জনগণের সার্বিক আর্থিক সহযোগিতা এবং সাবেক পরিচালক আলহাজ্ব মাওলানা আবুল বয়ান সাহেব (রহ.) এর অক্লান্ত পরিশ্রমে মাদ্রাসার শত বছর পূর্বের জরাজীর্ণ পুরনো ভবন গুলো ও মসজিদটি ভেঙে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। সেই সাথে পাকা ঈদগাহ মাঠের সংস্কার কাজও দ্রুত গতিতে শেষ হয়েছে।
#উপসংহার
সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসা ও এতিমখানা কেবল একটি প্রথাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি শতবর্ষের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক জীবন্ত স্মারক। মহান আল্লাহ তাআলা ইসলামের এই ঐতিহ্যবাহী পতাকাবাহী কেল্লাকে কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষুণ্ন ও জারি রাখুন। আমীন।
#লেখক:
মাওলানা ছাঈদ কোদালাভী
সাবেক লেকচারার, ইসলামিক গাইডেন্স এন্ড দাওয়াহ বিভাগ সৌদি আরব।
বর্তমান শিক্ষক ও হিসাব বিভাগীয় প্রধান সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসা রাংগুনিয়া চট্টগ্রাম।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন