হাফেজ মাওঃ আহমদুর রহমান (রহঃ)



তার সংক্ষিপ্ত কর্ম জীবনী --- শায়খ ছাঈদ কোদালাভী

চট্রগ্রামস্হ রাঙ্গুনীয়া থানার কোদালা ইউনিয়নের দক্ষিন পাড়ায় তিনি জন্ম গ্রহন করেন। জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার মুপ্তী আজিজুল হক (রহঃ) এর একজন সুযোগ্য খলীফা আজিজি বাগের কাঁটা ছাড়া ফুল, সৈসব হতেই দ্বীনদার মুত্তাকী ছিলেন,কথা বলতেন কম সর্বদা আল্লাহর ধ্যানে মত্ত থাকিতেন, পড়া শোনার ফাঁকে ফাঁকে ওস্তাদের খেদমত করতেন, অলিকুল শিরূমনি যুগ শ্র্রেষ্ট আলেমে দ্বীন আল্লামা মুপ্তী আজিজুল হক (রহঃ) ছিলেন তার প্রধান ওস্তাদ, প্রাণের চেয়েও বেশি ভাল বাসতেন নিজ ওস্তাদ কে, পটিয়া মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করার পর নিজ ওস্তাদ মুপ্তী সাহেব হুজুর তাকে চন্দনাইশ বসরত নগর মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান করেন, তৎকালীন বসরত নগর মাদ্রাসার মুহতামিম ছিলেন মুপ্তী আজিজুল হক (রহ) এর অপর খলীফা মাওলানা মফজল আহমদ (রহ) তিনিও এক আল্লাহর অলি ছিলেন, দুই পীর ভাই একি মাদ্রাসায় কিন্তু মাওলানা আহমদুর রহমানের মন কিছুতেই বসেনা, কি যেন হাঁরিয়ে ফেলেছে শুধু ওস্তাদের কথা মনে পড়ে,দিনের বেলায় ছাত্রদের পড়িয়ে বিকালে পাড়ি দিতো ওস্তাদের কাছে পটিয়া মাদ্রাসায়,তখনকার যুগে গাড়ি বা অন্য কোন যানবাহন ছিলনা হেঁটে হেঁটে চলে আসতেন অতটুকু পথ শুধু ওস্তাদের টানে, আমি অধম যখন কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসায় পড়তাম তখন প্রায় সময় হুজুর কে ছাত্রদের মসজিদে নসিহতের সময় বলতে শুনতাম, হুজুর কেঁদে কেঁদে বলতেন বসরত নগর মাদ্রাসায় আমার মন বসতনা আমার মনে হতো হুজুর কে তাহাজ্জদের সময় গরম পানী করে দেবে কে?  অজুর পানী কে ডেলে দেবে? এসব মনে উঠলে আমি আর থাকতে পারতামনা,পাগলের মতো ছুঠে যেতাম পটিয়া,মাওলানা আহমদুর রহমান (রহ) কোদালা মাদ্রাসার ছাত্রদের তাহাজ্জদ ও জিকিরের তাকিদ করতে গিয়ে পটিয়ার মুপ্তী সাহেব (রহ) এর জিকিরের বর্ণনা দিয়ে বলতেন -
হুজুর যখন জিকির করতেন তখন কোরবানীর গোস্ত সিদ্ব্ধের ন্যায় গব্ গব্  আওয়াজ দিতো, এসব কথা গোলো বলতেই প্রায় সময় বিকট শব্দে আওয়াজ দিয়ে মসজিদে হুজুর বেহুশ হয়ে যেতেন।

একদিন হঠাৎ পটিয়া মাদ্রাসায় এসে মুপ্তী সাহেবের রূমে গিয়ে হুজুর কে বললেন-
আমি আর চাকুরী করবনা আমি আবার এখানে ভর্তি হয়ে কোরআন মজীদ হেফজ্ করবো ছাত্রের আগ্রহ দেখে মুপ্তী সাহেব হুজুর আর না করলেন না।হুজুরের খেদমতে থেকেই  হাফেজ হলেন।
এ জন্য তিনি কোদালাতে হাফেজ সা'ব হুজুর নামে ও খ্যাত যেমন মাওলানা মেহেরূজ্জামান সাহেব মুহতম সা'ব নামে খ্যাত।

কোদালা মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে নিয়োগঃ

১৯৩৩-১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর যাবত সুদক্ষতার সাথে কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসা পরিচালনার পর মাওলানা মেহেরূজ্জান সাহেব (রহ) কোদালা হতে সেচ্ছায় পূর্ব সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসায় চলে যায়, পরে কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসার পরিচালনার ভার দেয়া হয় কোদালা বারয়ের বাড়ীর মাওঃশফি সাহেব কে তিনি ৪ বছর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, বিভিন্ন কারনে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ হলেন,

১৯৬১ সালে তৎকালিন পটিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম আল্লামা শাহ ইউনুস ( হাজী সাব হুজুর রহঃ) এর সভাপতিত্বে মজলিসে শূরার মাধ্যমে সরফভাটার মাওলানা সোলতান সাহেব (রহ) কে মুহতামিম পদে নিয়োগ দেয়া হয়,
একি বছর হাফেজ মাওলানা আহমদুর রহমান (রহ) কেও কোদালা মাদ্রাসার হিফজ বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়।
এভাবে ২ বছর পরিচালনা করেন  মাওঃ সুলতান সাহেব (রহ)।

নায়েবে মুহহতামিম পদে নিয়োগঃ

২৫ শে মে ১৯৬৪ ইং ২৯ জিলক্বদ্ ১৩৮০ হিজরী
মজলীসে শূরার আহবান
সভাপতিঃ জিরি মাদ্রাসার তৎকালিন মুহতামিম পীরে কামেল আল্লামা শাহ আহমদ হাসান (রহ)
অধিবেশনে মাদ্রাসা পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব পটিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম এর উপর ন্যাস্ত করা হয়,
এবং হাফেজ মাওঃ আহমদুর রহমান কে নায়েবে মুহতামিম হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়,
তিনি ছিলেন আধ্যাত্বিক ইলমের অধিকারী, আল্লাহর প্রতি ছিল তার পূর্ণ আষ্হা, নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন কোদালা মাদ্রাসার জন্য, কোন দিন কারো কোন প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয়নি উনাকে,দিন দিন ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি হতে লাগলো কিন্তু মাদ্রাসায় খাদ্যের অভাব কখনো দেখা যায়নি, কোন বড় ধরনের মিটিং বা শূরার প্রয়োজন ও হয়নি,
তিনি ১৯৬৪ - ১৯৯৩ পর্যন্ত প্রায় ৩০ বছর যাবত নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও নিষ্টার সাথে সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন।

উনি যে সহকারী পরিচালক তা ৩০ বছর যাবত কেউ কল্পনাও করতে পরেনি সবাই জানতো তিনিই মুহতামিম,
উনার কর্ম দক্ষতা, সততা,আন্তরিকতা এবং মাদ্রাসার প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালবাসা দেখে সবাই মুগ্ধ।

ষ্হায়ী মুহতামিম পদে নিয়োগঃ

৩১ আগষ্ট ১৯৯৩ ইং ১৩ রবিউল আওয়াল ১৪১৪ হিজরী আল্লামা শাইখ হারূন ইসলামাবাদী (রহ) এর সভাপতিত্বে অনুষ্টিত মজলিসে শূরা'র অধিবেশনে হুজুর কে ষ্হায়ী মুহতামিম ঘোষনা করা হয়।
৭ ই এপ্রিল ২০০৬ সাল শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় ৪৩ বছর যাবত কোন এস্কাল বিহিন  পরিচালনার এ মহান দায়িত্ব পালন করে যান তিনি,দিন দিন মাদ্রাসা ও ছাত্রদের লেখা পড়ার উন্নতি সাধিত হয়, দেশ ব্যাপী লেখা পড়ায় সুনাম অর্জন করতে থাকে, মাওলানা আইয়ুব সাহেব (রহ) ছিলেন তখনকার কোদালা মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক, আজকের কোদালা মাদ্রাসার মুহতামিম ইলমের সাগর  আলহাজ আল্লামা মুপ্তী আবদুল কাদের ( হাফিজাহুল্লাহ) এর মতো হাজারো আলেম তাদেরই হাতে গড়া।

তিনি স্বপরিবারে দক্ষিন পাড়া হতে কোদালা মাদ্রাসার পার্শ্বেই বসতি স্হাপন করেন, তিনি জীবনের বেশির ভাগ সময় মসজিদেই কাটিয়েছেন, রাত্রে অতি অল্প সময় তিনি বাড়িতে আরাম করতেন।
 তিনি বেশী কথা পছন্দ করতেন না সারাক্ষন মসজিদের বারিন্দায় বসে কোরআন মজীদ তেলাওয়াত করতেন, ছাত্রদের ক্লাস ও করাতেন একি স্হানে।
নম্রতা ও স্বভাবঃ
তিনি ছিলেন অত্যান্ত নম্র ও শান্ত স্বভাবের লোক,ছাত্রদের নসিহতের সময় প্রায় ওনার পীর ভাই বোয়ালবী সাহেব হুজুরের উদ্বৃতি দিয়ে বলতেন " আমার নিচে নিচ নেই আমার পরে পর নেই"
চলার সময় সব সময় নজর থাকতো নিছের দিকে, নফস (দিল) কে সব সময় দমন করতো,
 তিনি রাত তিনটায় চলে আসতেন মাদ্রাসায়, অনেক সময় হুজুর কে ছাত্রদের ডাকার আগে মাদ্রাসার পশ্চিম দক্ষিন দিকে ছাত্র শিক্ষকদের তখনকার টিনের বাথরূম গূলো পরিষ্কার করতে দেখা যেতো, পুকুর হতে বালতিতে করে পানী এনে বাথ রূমে মারতেন এবং নিজের পা দিয়ে তা পরিষ্কার করতেন,  তাহাজ্জদের জন্য ছাত্রদের ডেকে দিয়ে মসজিদে তাহাজ্জদ আদায় করে লেগে যেতেন আপন মাওলার জিকিরে, এমন ভাবে জিকির করতেন আওয়াজ মাদ্রাসা ছেড়ে পুরা এলাকায় ছড়িয়ে যেত, ওনার জিকিরে আল্লাহ শব্দ টা দুই রখম আওয়াজে বের হতো, জিকিরের পরে কেঁদে কেঁদে দোয়া করতেন।

তাকওয়াহঃ
হুজুর নিজের কাপড় গূলো নিজেই ধুইতেন, সব সময় মসজিদের কোনায় একটি সাদা লুঙ্গি থাকতো প্রত্যহ নামাজের পূর্বে কাপড় বদল করেই নামাজ পড়তেন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে  রাসুল (স) এর সুন্নাতের উপর ছিলেন অটল,মিসওয়াক ও পাগড়ী ছিল নিত্ত সঙ্গী,পরিবার অসূষ্হ হলে বাড়ির সব কাজ নিজেই করে দিতেন, নিজ হাতে কাপড় কেঁচে দিতেন।
হজুর বয়ান করতে পারতেন না ৫/১০ মিনিট বয়ান করার পর কবর হাসরের কথা বলতেই কাঁদতে কাঁদতে বেহূশ হয়ে যেতেন পরবর্তিতে ডাক্তারগণ বয়ান করতে নিষেধ করে দেন, তাই সাধারণের মাঝে অত প্রসিদ্ধতা লাভ করেনি।

হুজুরের অনেক কারামত ও অজানা ঘঠনা রয়েছে লিখতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে, সুযোগ হলে কোন দিন ইনশা আল্লাহ কাগজেই লিখবো।

তিনি আমাদের মাঝে সুন্নাতের এক আলোকোজ্জল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন, স্মরণীয় হয়ে থাকবেন লক্ষ লক্ষ ছাত্র ও ভক্তদের হৃদয়ে।

ইন্তেকালঃ

তিনি গত ৭ ই এপ্রিল ২০০৬ বাদে জুমা সকল কে ছেড়ে মাওলার রহমতের ডাকে সাড়া দেন, এবং কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসার জামে মসজিদের দক্ষিন পার্শ্বে সমাহিত হন।
মৃত্যূকালে তিনি তিন ছেলে (১) হাফেজ মুহিব্বুল্লাহ (২) হাফেজ এমদাদ উল্লাহ (৩) হাফেজ আজিজ উল্লাহ ও তিন মেয়ে সহ অসংখ্যা ভক্ত ও ছাত্রদের সদকায়ে জারিয়া স্বরূপ রেখে যান।

হে আল্লাহ তুমি আমাদের হুজুর কে তোমার রহমতের চাদর দিয়ে ঘিরে রেখো এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করো---- আমীন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র ও রেজাল্ট বাংলা ভাষায় করা হোক!

কওমী মাদ্রাসা সনদ স্বীকৃতি প্রসঙ্গঃ

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (ইত্তেহাদুল মাদারিস) মারকাজী পরীক্ষা-২০১৯ এর ফল প্রকাশ!