মাওলানা মেহেরুজ্জামান (রহঃ)
সংক্ষিপ্ত কর্ম জীবনীঃ-
- ছাঈদ কোদালাভী
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলা ভূমি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া থানার ১২ নং কোদালা ইউনিয়ন,
পূর্ব পশ্চিম ও দক্ষিনে সবুজে ঘেরা কোদালা চা বাগান এবং উত্তরে কাপ্তাই লেক ও সিতার পাহাড়ের ঝর্ণা হতে আবহমান কর্ণফুলী নদীর দক্ষিন কূল ঘেঁষে অবষ্হিত এ গ্রাম,
এটি একটি সম্পূর্ণ বিদআত ও শির্ক মূক্ত গ্রাম, নেই কোন বেদআত পন্হি মাদ্রাসা নেই কোন মাজার।
কোদালা কে খোদা ওয়ালা গ্রাম উপাধি দিয়ে ছিলেন পটিয়া মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা পীরে কামেল আল্লামা শাহ মুপ্তী আজিজুল হক (রহঃ) কোদালার এমন কোন পাড়া নেই যেখানে হযরতের কদম পড়েনি।
এখানেই জন্ম গ্রহন করেছেন অনেক বুজুর্গানে দ্বীন ও যুগ শ্রেষ্ট আলেম,
তাদের মধ্যে আল্লামা শাহ মেহেরূজ্জামান (রহঃ) আল্লামা হাফেজ শাহ আহমদুর রহমান (রহঃ) মাওঃ আবদুল কাইয়ুম (নান সা'ব হুজুর রহঃ) মাওলানা আবদুল কুদ্দুস (রহ) মাওলানা নুরূল হক সাহেব (রাইখালী) ও আন্তর্জাতিক ক্বারী মাওঃ ক্বারী ওবায়দুল্লাহ'র মতো বহু খ্যাতিমান ওলামায়ে কেরাম।
জন্ম ও ছাত্র জীবনঃ
এই গ্রামেই আল্লামা শাহ মেহেরুজ্জামান রহঃ ১৯০১ সালে জন্ম গ্রহন করেন, এবং রাঙ্গুনীয়ার চন্দ্রঘোনা হাজী পাড়া মক্তবে রাহে নাজাত পর্যন্ত প্রাথমিক ইসলামী শিক্ষা অর্জন করে চট্টগ্রাম জিরি মাদ্রাসায় চলে যান এবং সেখানে ৮ম শ্রেনী
(ছাহারুম) পর্যন্ত পড়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য হাটহাজারী আরবী বিশ্ব বিদ্যালয়ে গমন করেন, ওখান থেকে ১৯২৪ সালে দাওরায়ে হাদীস (টাইটেল) পাশ করে একজন সুদক্ষ আলেম ও বর্ষিয়ান বক্তা হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন।
কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসা নির্মানঃ
আল্লামা শাহ মেহেরূজ্জামান ও হাফেজ আহমদুর রহমান এরা দুজন ছিলেন মুপ্তী আজিজুল হক ( রহঃ) এর সুযুগ্য খলীফা, হাটহাজারী মাদ্রাসায় লেখা পড়া শেষে ওষ্তাদ স্বিয় ছাত্র মেহেরূজ্জামান কে নিজ গ্রামে একটি মাদ্রাসা ষ্হাপনের নির্দেশ দেন, ওষ্তাদের নির্দেশে ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্টা করেন কোদালা আজিজিয়া কাছেমুল উলুম মাদ্রাসা।
সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসার দায়িত্ব গ্রহনঃ
১৯৫৮ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৫ বছর যাবত কোদালা আজিজিয়া মাদ্রাসা পরিচালনা করার পর সেচ্ছায় চলে যান বাংলার ৬ষ্ট প্রাচীনতম মাদ্রাসা সরফভাটা মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসায়, যে মাদ্রাসার গর্বিত ছাত্র খুদ শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফি হাফিজাহুল্লাহ।
এখানেই তিনি পরিচালনার মহান দায়িত্ব পালন করেন প্রায় দির্ঘ্য ৪০ বছর।
(ঐ মাদ্রাসায় এ অধমের "ছাঈদ কোদালাভী'র" ৪ বৎসর খেদমত করার সুযোগ হয়েছিল)
সুদক্ষতার কারনে তিনি ওখানে খ্যাতি অর্জন করেন অনেক, রাঙগুনিয়ায় প্রসিদ্ধ হন মুহতম সা'ব নামে, মাঝ খানে একবার মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসা হতে রাগ করে তিনি রাঙ্গুনীয়া ইছাখালী রহমানিয়া মাদ্রাসায় চলে যান এবং ৯ মাস পর্যন্ত ঐ মাদ্রাসার পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, ৯ মাস পর সরফভাটার জনগন পুনরায় হুজুর কে মুয়াবিনুল ইসলাম মাদ্রাসায় নিয়ে আসেন।
রাজনীতিঃ
তিনি যেমন বিজ্ঞ আলেম তেমন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও ছিলেন, রাঙ্গুনীয়া থানা নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি ছিলেন অনেক বছর ধরে,
১৯৭০ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেজামে ইসলাম পার্টি হতে বই মার্কা প্রতিক নিয়ে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করেন এবং আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাসেম এর কাছে পরাজিত হন।
শত বছরের শ্রেষ্ট শিক্ষার্থীঃ
১৯৯৬ সালে চট্টগ্রাম হাট হাজারী আরবী বিশ্ব বিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত "শত বার্ষিকী সমাবর্তন" অনুষ্ঠানে একশ বছরের ২০০ জন কৃতি ছাত্রদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ট শিক্ষার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।
বর্শিয়ান বক্তাঃ
তিনি যেমন একজন অাল্লাহর অলী তেমন একজন দ্বীনের দাঈ ও বটে আজীবন মানুষ কে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক জুড়তে দেশের প্রত্যান্ত এলাকায় বয়ান করতে যেতেন, এবং সকল মুসলিমদের ঐক্য করতে আজীবন প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, ওহাবী সুন্নী বলে যারা মুসলমানদের ভাগ করতো তিনি তাদের পেট্য (পেটুক) ও ভাত্ত মৌলভী বলে আখ্যা দিতেন, তিনি ওহাবী সুন্নী সকলের মাহফিলে বয়ান করতেন, এবং ধর্ম নিয়ে দলাদলি না করে সকল কে এক হয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠার আহবান করতেন।
মেহেরিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠাঃ
জীবনের শেষের দিকে ১৯৯৬ সালে তিনি চলে যান মধ্যম সরফভাটা এবং সেখানে প্রতিষ্টা করেন মেহেরিয়া মুঈনুল ইসলাম নামক এক বিরাট মাদ্রাসা যেখানে আজ চালু হয়েছে দারসুল হাদীস বা দাওরায়ে হাদীস,
তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত আল্লাহর অলী রাসুেলর সুন্নাহর উপর ছিলেন আজীবন অটল,ঘুম ব্যতিত সর্বদা মাথায় থাকতো সুন্নাতের পাগড়ী,যেমন ছিলেন বুজুর্গ তেমন ছিলেন সৌখিন ঘোড়ায় চড়ে বয়ান করতে যেতেন, ওনার বয়ান ছিল খুবই যজবা পূর্ণ, প্রতি বছর পটিয়া মাদ্রাসার সালানা জলসায় ফজরের নামাজের পর বয়ান করতেন তিনি,
বয়ানে লাফিয়ে লাফিয়ে অনেক লোক বেহুশ হয়ে যেত, তিনি এই শেয়েরটা প্রায় বয়ানে রাসুলের মুহাব্বতে যজবার সাথে পড়তেন-
محمد مصطفى نور على نور
شاه جن و ملك انس فريهون...
এবং নিজের ওস্তাদের কথা স্বরণ হলে প্রায় সময় এ শেয়েরটা পড়তেন- আর দোয়া করতেন-
بهر شيخى مرشدي شاه مفتي عزيزالحق ولي
بهرمولانا ضميرالدين خضرت غنغوهي.....
আজীবন মানুষ কে ডেকেছেন শান্তি ও ঐক্যের পথে, কন্ঠ ছিল সুমধুর।
ওনার ৬ ছেলে ও ২ মেয়ে, তাদের মধ্যে জনাব নেয়ামত উল্লাহ বিএসসি ও মাষ্টার হাবিবুল্লাহ এবং ৪ জন আন্তর্জাতিক মানের ক্বারী অন্যতম।
১- বাংলাদেশ সংসদ বেতার ও বিটিভি'র সাবেক প্রধান ক্বারী ঢাকা চকবাজার শাহী জামে মসজিদের সাবেক খতীব জনাব ক্বারী ওবায়দুল্লাহ,
২- ক্বারী ফয়জুল্লাহ,
৩- ক্বারী রহিমউল্লাহ প্রধান ক্বারী ও শিক্ষকঃ মেহেরিয়া মাদ্রাসা,
৪- ক্বারী সাইফুল্লাহ ইমাম ও খতীব জামে ওসমান বিন আফ্ফান ইউ এ ই।
আজ রাংগুনিয়ার অধিকাংশ ঘরে ঘরে অসংখ্য আলেম হাফেজ ও ক্বারী সবি তারই অবদান।
তার লিখিত গ্রন্হঃ
১-আল্লাহর ভালবাসা কোন পথে?
২- রাসুলের ভালবাসা কোন পথে?
৩- ইসলামী রাজনীতির প্রয়োজন কেন?
তিনি ১৯৯৭ সালের ২২ শে ডিসেম্বর সোমবার দিবাগত রাত পৌনে তিনটায় অসংখ্যা ভক্ত ও ছাত্রদের কাঁদিয়ে নিজ মাওলার ডাকে সাড়া দেন, এবং তারই হাতে গড়া মেহেরিয়া মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসা মাঠেই সমাহিত হন।
হে আল্লাহ, আপনি হুজুর কে ক্ষমা করে দিন এবং জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন ,,,আমীন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন