হজ্বের ফজীলত ও জরুরী নিয়মাবলীঃ


- শাইখ ছাঈদ কোদালাভী

হজ্ব ইসলামের বুনিয়াদী পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম।
হজ্বের মাধ্যমে দুনিয়ার সবকিছুর ঊর্ধ্বে মহান আল্লাহর নির্দেশ সমুন্নত রাখা, তাওহীদকে শিরোধার্য করা এবং আল্লাহ প্রেমের সর্বোচ্চ নিদর্শন পেশ করা হয়।
লক্ষ লক্ষ লোক ঐক্যবদ্ধভাবে এক কণ্ঠে উচ্চস্বরে আল্লাহর তাওহীদ ঘোষণা করে।
আল্লাহ প্রেমের অমিয় ধারা পান করতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসে সৌদী আরবের মক্কায়।

ফরযঃ
৯ম হিজরীতে হজ্ব ফরয হয়।
বিত্তশীল ও সামর্থ্যবানদের উপর জীবনে একবার হজ্ব করা ফরয।

হজ্বের ফযীলতঃ
হযরত আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্ব করেছে হজ্বে কোন রকম অশ্লীল আচরণ করেনি এবং গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়নি সে নবজাত শিশুর মত নিষ্পাপ অবস্থায় ফিরে আসবে যে দিন তার মা তাকে প্রসব করেছে (বুখারী মুসলিম)।

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে রসূল (স.) বলেন, মাবরূর তথা কলুষমুক্ত হজ্বের পুরস্কার হচ্ছে জান্নাত (বুখারী, মুসলিম)।

পক্ষান্তরে হজ্ব ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ তা আদায় না করে মৃত্যুবরণ করে রসূল (স.) তার প্রতি কঠোর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।

আবূ উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত রসূল (স.) বলেন, যার কোন প্রকাশ্য অসুবিধা নেই, অত্যাচারী শাসকও যার পথ রোধ করেনি অথবা কোন রোগ তাকে আটকে রাখেনি এতদসত্ত্বেও সে যদি হজ্ব না করে মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে চাইলে ইহুদী হয়ে মৃত্যুবরণ করুক অথবা খৃস্টান হয়ে মৃত্যুবরণ করুক (দারেমী)।

হজ্ব ফরয হওয়ার শর্তাবলী ঃ
হজ্ব ফরয হওয়ার শর্ত হলো:
১। মুসলমান হওয়া
২। সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া। পাগলের ওপর হজ্ব ফরয নয়।
৩। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া
৪। স্বাধীন হওয়া
৫। মক্কায় যাতায়াত এবং সেখানে অবস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ থাকা।
৬। পথ নিরাপদ থাকা
৭। হজ্ব থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবার পরিজনের ভরন-পোষণ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের ব্যবস্থা থাকা ৮। মহিলাদের জন্য ‘মাহরাম’ সাথে থাকা। মাহরাম অর্থ স্বামী অথবা এমন কোন আত্মীয় যার সাথে বিবাহ হারাম।

হাজ্বীদের করণীয়ঃ
মীকাত থেকে ইহরাম বেঁধে হজ্বের কার্যক্রম শুরু করতে হয়।
ইহরাম বাঁধা ছাড়া মক্কায় প্রবেশ করা জায়েয নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত লোকদের জন্য পাচঁটি মীকাত রয়েছে যা আমি গত কালের প্রবন্ধে বিস্তারিত উল্যেখ করেছিলাম-
১। যুল হুলায়ফা; বর্তমান নাম বিরে আলী। এটি মদীনাবাসীদের মীকাত। মক্কার পথে মদীনা থেকে ৮/৯ কিলোমিটার দূরে।

২। যাতু ইরক: ইরাক ও ইরাকের পথে আগত লোকদের মীকাত। মক্কা থেকে উত্তর পূর্ব দিকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে।

৩। জুহফা: সিরিয়া ও সিরিয়ার দিক থেকে আগত লোকদের মীকাত। মক্কা থেকে পশ্চিম দিকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরে।

৪। কারনুল মানযেল:নাজদ বা রিয়াদের দিক থেকে আগত লোকদের মীকাত। মক্কা থেকে পূর্ব দিকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে।

৫। ইয়ালামলাম:এটি ইয়ামান ও এ পথে আগত লোকজনের জন্য এবং ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশীদের জন্য মীকাত। মক্কা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ৬০ মাইল দূরে।

হজ্ব এর ফরয ৩টি:
১। ইহরাম বাঁধা
২। আরাফার ময়দানে অবস্থান করা, অল্প সময়ের জন্য হলেও।
৩। তাওয়াফে যিয়ারত করা যা ১০ যিলহজ্ব কুরবানি করার পর থেকে ১২ তারিখের মধ্যে যে কোন সময় করতে হয়।

হজ্বের ওয়াজিবসমূহঃ
১। সাফা-মারওয়ার মাঝখানে সাঈ করা এবং তা সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় শেষ করা।
২। মুযদালিফায় অবস্থান করা। বিশেষত সুবহি সাদিকের পর থেকে সূর্যো দয়ের সামান্য পূর্ব পর্যন্ত।
৩। রামী করা অর্থাত্ মিনায় অবস্থিত জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করা
৪। ১০ তারিখ বড় জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপের পর কুরবানি করা। এটা শুধু কিরান ও তামাত্তু হজ্ব আদায় কারীর জন্য ৫। মাথা মুণ্ডণ করা অথবা চুল ছেঁটে ছোট করা
৬। তাওয়াফে সাদর বা বিদায়ী তাওয়াফ করা। যারা মীকাতের বাইরে থেকে আসেন এ বিধানটি শুধু তাদের জন্য; মক্কাবাসীদের জন্য নয়।
৭। তাওয়াফে যিয়ারত আইয়ামে নাহ্র অর্থাত্ ১০-১২ তারিখের মধ্যে সম্পাদন করা
৮। জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ, কুরবানি ও মাথা মুন্ডণের ক্রমধারা রক্ষা করা।

হজ্বের প্রকারভেদঃ
হজ্ব পালনকারীর অবস্থা ভেদে হজ্ব ৩ প্রকার:
১। হজ্বে ইফরাদ
২। হজ্বে কিরান
৩। হজ্বে তামাত্তু।
হজ্বে ইফরাদ ঃ ইফরাদ ঐ হজ্বকে বলে,যার সাথে উমরা করা হয় না। শুধু হজ্বের নিয়তেই ইহরাম বাঁধা হয় এবং শুধু হজ্বের রীতি নীতি পালন করা হয়। এ ধরনের হজ্ব পালনকারীর ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়।

হজ্বে কিরান ঃ হজ্ব ও উমরার ইহরাম একসাথে বেঁধে উভয় কাজ সম্পন্ন করা। কিরান হজ্ব পালনকারী ব্যক্তিকে হজ্বের শেষ দিন পর্যন্ত ইহরাম বাঁধা অবস্থায় থাকতে হয়। তার ওপর কুরবানি ওয়াজিব। বিদায় হজ্বে রাসূল (স.) হজ্বে কিরান করেছিলেন।

হজ্বে তামাত্তু ঃ পৃথক পৃথকভাবে ইহরাম বেঁধে হজ্ব ও উমরা পালন করা। প্রথমে উমরার ইহরাম বেঁধে তা আদায় করবে। অতপর হালাল হয়ে যাবে এবং ইহরামের পোশাক খুলে ফেলবে। এ সময় ইহরাম অবস্থায় যেসব কাজ তার উপর হারাম ছিল তা তার জন্য হালাল হয়ে যাবে। এ ধরনের হজ্বেও তার উপর কুরবানি ওয়াজিব।

কোন্ ধরনের হজ্ব উত্তম?
কোন কোন হাদীসে হজ্বে কিরানকে উত্তম বলা হয়েছে, যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত, রসূল (স.) বলেন, ‘তোমরা হজ্ব ও উমরাকে একত্রে মিলিয়ে আদায় কর। কারণ এ দু’টি দারিদ্র্য ও গুনাহ এমনভাবে নির্মূল করে দেয় যেমন আগুনের চুল্লি লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা নির্মূল করে দেয় (তিরমিযী)।

আবার কোন কোন হাদীস দ্বারা তামাত্তুর ফযীলত বেশী বুঝা য়ায়। বিদায় হজ্বের দিন যে সকল সাহাবী কুরবানির জন্তু সাথে নেননি রসূল (স.) তাদেরকে তামাত্তু হজ্ব করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, যারা কুরবানির জন্ত্তু সাথে আনেনি তারা যেন উমরা করে হালাল হয়ে যায়। আমি কুরবানির জন্তু সাথে না আনলে আমিও উমরা করে হালাল হয়ে যেতাম।

তামাত্তু উত্তম না হলে রসূল (স.) তা করার আগ্রহ প্রকাশ করতেন না। তবে মক্কা পৌঁছার পর যদি সময় বেশি থাকে তাহলে তামাত্তু করবে। আর যদি সময় কম থাকে তাহলে কিরান হজ্ব করবে।

উপসংহারঃ
সুতরাং আল্লাহ যাকে সামর্থ্য দিয়েছেন তার উচিত জীবনে একবার হলেও হজ্ব পালন করে অশেষ ছওয়াব ও জান্নাত লাভের এবং জাহান্নামের ভয়াবহ আগুন থেকে বাঁচার চেষ্টা করা।

হে আল্লাহ,
আমাদের সকল কে বারবার তোমার ঘরের হাজিরা প্রদান ও রাওজায়ে আতহারের জিয়ারত করার তৌফিক দান করুন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র ও রেজাল্ট বাংলা ভাষায় করা হোক!

কওমী মাদ্রাসা সনদ স্বীকৃতি প্রসঙ্গঃ

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (ইত্তেহাদুল মাদারিস) মারকাজী পরীক্ষা-২০১৯ এর ফল প্রকাশ!