মহিলাদের জন্য হজ্বের ১০টি জরুরী বিষয়!

- শাইখ ছাঈদ কোদালাভী

১. নারী-পুরুষ পরস্পর পরস্পরের বদলি হজ করতে পারবে। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, ‘খাছআম গোত্রের এক মহিলা রাসুলকে সা. বলল, ‘আল্লাহ বান্দার ওপর যে হজ ফরজ করেছেন তা আমার বৃদ্ধ পিতার ওপর এমন সময় ফরজ হয়েছে, যখন বার্ধক্যের কারণে সে বাহনে চড়তে অক্ষম। আমি তার পক্ষ থেকে হজ করলে তার হজ আদায় হবে কি? তিনি সা. বললেন, হ্যাঁ! অবশ্যই হবে। (সহিহ বুখারি; ১৭৩৩; সহিহ মুসলিম, ১৩৩৪।) ইবনে মুনযির বলেন, এ ব্যাপারে আলেমদের কোন মতবিরোধ নেই। (ইবনে কুদামা, আল-মুগনি, ৫/২৭।)

২. হানাফী ও হাম্বলি বিশেষজ্ঞদের মতে, মহিলাদের ওপর হজ ফরজ হওয়ার জন্য মাহরাম শর্ত। মাহরাম না থাকলে অঢেল সম্পত্তি থাকা সত্তেও তার ওপর হজ ফরজ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ২/১২৩।) কোন মহিলা যদি মাহরাম ছাড়া হজ করে তবে হজ আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু মাহারম ব্যতিত সফর করার কারণে গুনাহগার হবে। (হেদায়া, ১/২১৩।) ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রসুাল সা. বলেছেন, ‘মাহরাম ছাড়া কোন পুরুষ কোন নারীর সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ করবে না এবং কোন নারী মাহরাম ব্যতীত সফর করবে না। এক সাহবী বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার স্ত্রী হজ করতে যাচ্ছে আর আমি অমুক যুদ্ধে নাম লিখিয়েছি। রাসুল সা. বললেন, তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজে যাও।’ (সহিহ বুখারি, ১৭৪০; সহিহ মুসলিম, ৩১৩৬।)

৩. শাফেয়ী ও মালেকি বিশেষজ্ঞদের মতে, মহিলাদের ওপর হজ ফরজ হওয়ার জন্য মাহরাম শর্ত নয়, শর্ত হল তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া। সফরের পথ যদি নিরাপদ হয় তবে মাহরামহীন একজন মহিলা একদল মাহরামওয়ালী মহিলাদের সঙ্গে হজে যেতে পারবে। (আল উম্ম, ২/১২৭।) আদী ইবনে হাতেম রা. হতে বর্ণিত, রাসুল সা. বলেছেন, ‘হে আদী! তোমার জীবনকাল যদি দীর্ঘ হয়, তুমি অবশ্যই দেখতে পাবে, ইরাকের হীরা অঞ্চল থেকে একজন মহিলা একাকী উটের হাওদায় বসে কাবা তাওয়াফ করবে এবং সে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাবে না।’ (সহিহ বুখারী, ৩৪০০; সহিহ মুসলিম, ২৮৯৪।)

৪. মহিলাদের জন্য স্বামীর অনুমতি শর্ত নয়। তবে সব কাজে স্বামীর অনুমতি নেওয়া ও পরামর্শভিত্তিক কাজ করা মুস্তাহাব। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা পরামর্শভিত্তিক কাজ কর।’
(আলে ইমরান, ৩:১৫৯।) মাহরাম পাওয়া গেলে স্বামী অনুমতি না দিলেও হজ সম্পন্ন করা আবশ্যক। হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. বলেছেন, ‘আল্লাহর অবাধ্য হয়ে কোন মানুষের আনুগত্য চলবে না। আনুগত্য তো কেবল ভাল কাজে। (সহিহ বুখারি, ৪৩৪০; সহিহ মুসলিম, ১৮৪০।)

৫. স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দত অথবা তালাকের ইদ্দত পালনকারীণী মহিলার জন্য হজে যাওয়ার অনুমতি নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যাবে, তাদের স্ত্রীরা চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে।’ (সুরা বাকারাহ, ২:২৩৪।) ইদ্দত শেষ হলে পরের বছর (সামর্থ থাকলে) হজ করবে। (ফতোয়ায়ে রমিয়া, ৮/৬২-৬৩।) তবে হজের টাকা জমা দেওয়ার পরে স্বমী মারা গেলে সম্পদ রক্ষার্থে ও সম্পদের অপচয় রোধে একদল বিশেষজ্ঞের মতে, ইদ্দত অবস্থায় হজ করার অবকাশ রয়েছে। (দুররুল মুখতার, ৫/২৫।)

৬. ইমাম আবু হানিফা ও শাফেয়ীসহ অধিকাংশ বিশেষজ্ঞদের মতে, হায়েজ ও নিফাসগ্রস্ত মহিলাদের ইহরাম বাঁধার পূর্বে গোসল করা মুস্তাহাব। হযরত আয়শা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আসমা বিনতে উমায়স রা. যুলহুলায়ফা নামক স্থানে আবু বকরের পুত্র মুহাম্মাদকে প্রসব করলেন। রাসুল সা. আবু বাকরের মাধ্যমে তাকে গোসল করে ইহরাম বাঁধার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ মুসলিম, ২৭৭৩।) গোসল করা সম্ভব না হলে বা অসুবিধা বোধ করলে অযু করবে। (আসান ফেকাহ, ২/১৬২।)

৭. হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় মহিলারা তাওয়াফ ব্যতীত হজের অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। স্রাব শেষ হলে পবিত্র হয়ে তাওয়ায় করবে। আর ওষুধের মাধ্যমে মাসিক বন্ধ রেখে হজ করাও যায়েজ। তবে এমনটি করা নিষ্প্রয়োজন। (ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া, ১৫/৪৯১; ফাতহুল কাদির, ২/২৩৩; ফতোয়ায়ে রমিয়িা, ৮/৮৭।)

৮. ইহরাম অবস্থায় মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট রঙ্গের বা ধরণের পোষাক নেই। পরিপূর্ণরুপে সতর ঢাকা যায় এমন পোষাকই মহিলাদের ইহরামের পোষাক। খুব রংচটে (যা অপরের দৃষ্টি আকর্ষন করে), আটসাট কিংবা পুরুষদের অনুরুপ পোষাক সর্বাবস্থায় মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ। (আসান ফেকাহ/১৬৩।)

৯. নিকাব দ্বারা মুখ ঢাকা কিংবা গ্লাবস ব্যবহার করা ইহরাম অবস্থায় মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্র্ণিত, রাসুল সা. বলেছেন, কোন মুহরিম মহিলা মুখ ঢাকবে না এবং গ্লাবসও পড়বে না। (সহিহ বুখারী, ১৮৩৮।) তবে ইহরাম অবস্থায় মহিলারা গায়রে মাহরাম থেকে নিজেদের চেহারা সংরক্ষণ করতে পারবে। আয়শা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা ইহরাম বেঁধে রাসুলের সা. সঙ্গে সফর করতাম। এ সময় আমাদের চেহারা খোলা থাকত। আমাদের পাশ দিয়ে কোন পুরুষ অতিক্রম করলে মাথা থেকে চাদরে আঁচল টেনে দিতাম। তারা চলে গেলে আবার খুলে ফেলতাম। (সহিহ বুখারি, ১৮৩৩।)

১০. সকল আলেমরা একমত, ইহরামের সময় মহিলা পুরুষের ন্যায় ‘ইদতেবা’ (ইহরামের চাদরের মধ্যাংশ ডান বগলের নিচে এবং দুই মাথা বাম ঘাড়ের ওপর ফেলে রাখা) এবং তাওয়াফ ও সায়ীর সময় ‘রমল’ (ঘাড় উঁচু করে বড় কদমে দ্রুত বেগে চলা) করবে না। (তাহমিদু ইবনে আব্দুল বার, ২২/৭৮।

শেয়ার করে মা বোনদের পড়ার সুযোগ দিন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্র ও রেজাল্ট বাংলা ভাষায় করা হোক!

কওমী মাদ্রাসা সনদ স্বীকৃতি প্রসঙ্গঃ

কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (ইত্তেহাদুল মাদারিস) মারকাজী পরীক্ষা-২০১৯ এর ফল প্রকাশ!