সাহাবায়ে কেরামদের চট্টগ্রাম সফর!
- শায়খ ছাঈদ কোদালাভী
"চট্টগ্রাম" বিশ্বের সু-প্রাচীন জনপদ সমূহের একটি হিসেবে ঐতিহাসিক ও ভৌগলিকভাবে প্রমাণিত ও স্বীকৃত। এটা বাংলার বাবুল ইসলাম বা ইসলামের প্রবেশ দ্বার হিসাবে খ্যাত। এখানে তিন দিক দিয়ে ইসলামের আগমন ঘটে। প্রথমত: আরব বণিকগণের মাধ্যমে, দ্বিতীয়ত: হক্কানী পীর আউলিয়াদের মাধ্যমে, তৃতীয়ত: বিজেতাদের মাধ্যমে, এখানে উল্লেখিত প্রথম বিষয়টির উপর সংক্ষেপে আলোচনার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
আরব বণিকগণ :
আরব ছিলো খাদ্য ঘাটতির দেশ, তাদের বাধ্য হয়ে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বাইরে যেতে হতো। স্বয়ং রাসূল (সা) ও নিজেই এ রকম বেশ কয়েকটি কাফেলায় শরীক ছিলেন। তৎকালীন আমদানী রপ্তানী বাণিজ্যে আরবদের জুড়ি ছিলোনা। তাদের গ্রীষ্ম ও শীতকালীন বিদেশ যাত্রার কথা কুরআনে কারীমের সূরা কুরাইশে বর্ণিত হয়েছে।
আরব ভূ-খন্ড হচ্ছে একটি উপদ্বীপ। তার তিন দিকের স্থল ভাগের অধিকারী ছিল তৎকালীন দুই বৃহৎ পরাশক্তি রোম ও পারস্য, তাদের উপর দিয়ে বাণিজ্য পরিচালনা আরবদের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে সামুদ্রিক পথকে বেছে নিতে হয়। উজানের পানিতে কীভাবে জাহাজ চালাতে হয় এবং জোয়ার-ভাটায় জাহাজ চালানোর পদ্ধতি বিশ্ববাসী আরবদের থেকে শিখেছেন।
আরবদের এই নৌ বাণিজ্যের সময় বঙ্গোপসাগরে চট্টগাম বন্দর ছিল খুবই সুবিধাজক প্রোতাশ্রয়। আরবরা এখান থেকে সুগন্ধি ও মসল্লাজাত দ্রব্যাদি আমদানি করে ইউরোপের বাজারে বিক্রি করতো। আরবগণ যেমন তাদের বাণিজ্য জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে চষে বেড়াতো, ঠিক তেমনি চট্টগ্রামও তৎকালীন যুগে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি সম্পন্ন ছিলো। চট্টগ্রামের তৎকালীন যুগে নির্মিত জাহাজ অধ্যাবদি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। চট্টগ্রামের নাবিকগণও তাদের জাহাজ নিয়ে বহিঃসমুদ্রে গমন করতেন। ফলে আরবদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে।
আরবগণ মিশনারী জাতি। যেখানে যেতেন সেখানে বসতি গড়ে তুলতেন। এইভাবে ঐতিহাসিক দলিল ও দস্তাবেজের মাধ্যমে জানা যায় যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) এর আগমনের পূর্বেই চট্টগ্রামে আরব বসতি গড়ে উঠে।
এমনকি কর্ণফুলী নদীর নামটিও আরবদের দেয়া। আরবীতে করণফুল অর্থ লবঙ্গ। আরবদের লবঙ্গ ভর্তি একটি জাহাজ এই নদীতে নিমজ্জিত হয়েছিল বলেই এ নদীর নাম কর্ণফুলী।
আদি পিতার নাজিলের স্থান আর হিন্দের প্রতি আরবদের ঝোঁক বরাবরই ছিল। অধিকন্তু তৎকালীন জাহেলী যুগের আরব কবিদের কবিতায় আল হিন্দের কথা এসেছে। কাব ইবনে যোহায়ের ইবনে আবি সালমা যিনি ছিলেন এক আরব কবি এবং পরবর্তীতে আল্লাহর রাসুল (সা) এর একজন সাহাবি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ইসলাম গ্রহনের পূর্বে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে লিখতেন। পরবর্তীতে তওবা করেন এবং নিজেই ইসলাম গ্রহনের জন্য আল্লাহর রাসুল (সা) এর কাছে আসেন। যেদিন তিনি ইসলাম গ্রহন করলেন সেদিন তাঁর পাঠ করা কবিতাটির কয়েক লাইন ছিল এরকম-
আমি নিজের হাত অকপটে রেখেছি এমন এক ব্যক্তির হাতে,
যার রয়েছে প্রতিশোধ গ্রহনের পূর্ণ শক্তি এবং যার কথাই কিনা সবার উপরে।
আমাকে বলা হয়েছিল, তোমার নামে এরূপ অরূপ নালিশ রয়েছে আর তোমাকে করা হবে জিজ্ঞাসাবাদ।
অথচ নিশ্চয়ই রাসুল (সা) এমন এক নূর, যে নূর থেকে আলো পাওয়া যায়।
তিনি আল্লাহর তলোয়ার সমুহের মধ্যে একখানা হিন্দুস্তানি তলোয়ার।"
এই কবিতাটি আল্লাহর রাসুল (সা) এর জীবনী আর রাহিকুল মাখতুম সহ আরও অসংখ্য জায়গায় এসেছে। সেই সময়ে হিন্দ তথা হিন্দুস্তান তথা ভারত উপমহাদেশের অনেক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ছিল প্রশংসনীয়। হিন্দের প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থার সুনামের কথাও ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। উপরোল্লেখিত ঐতিহাসিক প্রমাণাদি হতে বুঝা যায় চট্টগ্রাম ও আরব সম্পর্ক বহু প্রাচীন।
দ্রাবিড়দেরকে এ অঞ্চলের প্রাচীন জাতি হিসেবে ধরা হয়। আর্যরা হিন্দুদেরকে তাদের আদি নিবাস কাস্পিয়ান হ্রদ এলাকা হতে এদেশে নিয়ে আসে। এক পর্যায়ে হিন্দু পূনর্জাগরণবাদীদের আশুরিক শক্তির দাপটে জৈন ধর্ম বিলুপ্ত প্রায়, বৌদ্ধদের অবস্থা তথৈবচ। ঠিক এই সময় বাংলার সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে প্রচারিত হয়েছিল সত্য ও সাম্যের ধর্ম ইসলাম।
প্রখ্যাত গবেষক গোপাল হাওলাদার বলেন, “বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে রুষ্ট হয়ে ব্রাহ্মণদের শাস্তি দেয়ার জন্য দেবতা নিযুক্ত করলেন। আর এ দেবতা হচ্ছে মুসলমান।
ড. ইবনে গোলাম সামাদের মতে ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে পর্তুগীজরা সর্ব প্রথম বাংলায় আসেন। তারা ১৫১৭ সালে চট্টগ্রামে ঘাটি গড়ে তোলেন। পর্তুগীজদের লেখা থেকে আমরা এ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক উপাদান পাই। প্রখ্যাত পর্তুগীজ পর্যটক জোয়াওদ্য বারোজ লিখেছেন “পর্তুগীজদের চট্টগ্রামে আসার প্রায় একশত বছর পূর্বে একজন সম্ভ্রান্ত আরব যুবক তার একুশ অনুচরসহ দক্ষিণ আরবের এডেন বন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসেন। তিনি তার দীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা করেছেন।
চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে কিছু আরব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন, উঁচু গন্তাস্থি বক্র এক নাক এবং উপবৃহত্তকার সংকীর্ণ মুখন্ডল তাছাড়াও অনেকেই আরব উপাধি যেমন শেখ, সৈয়দ ইত্যাদি ধারণ করে। অনেক স্থানের নামের সাথেও আরবী নামের মিল পাওয়া যায়। শোলক বহর, বাকলিয়া, আল করন ইত্যাদি,
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় প্রচুর আরবী উপসর্গ বিদ্যমান। বিশেষ করে ক্রিয়া পদের পূর্বে ‘না’ সূচক শব্দ ব্যবহার আরবী প্রভাবের ফল যেমন " নখাইয়ুম নযাইয়ুম নপাইজ্জুম ইত্যাদী।
বহুকাল আগে বহু সংখ্যক আরবী বণিক ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতের মালাবা, কালিকট ইত্যাদি এলাকায় আগমনের কথা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। যেমন বর্ণিত আছে যে, মালাবায়ে চেরর রাজা চেরুমল পেরুমল সিংহাসনে আরোহণের বর্ষপূর্তিতে প্রাসাদের ছাদে উঠলে প্রত্যক্ষ করেন যে, চন্দ্র দ্বি-খন্ডিত হয়ে দুই টুকরা দুই পাহাড়ে পতিত হয়েছে। বিস্মিত রাজা পরে জানতে পারেন যে, আরবে এক নবীর উদ্ভব হয়েছে। অধিবাসিরা তাঁর মুজিজা দেখতে চাইলে তিনি চন্দ্র দ্বি-খন্ডিত করে দেখান। রাজা বিবরণ শুনে স্বয়ং আরবে গিয়ে ইসলাম গ্রহন করেন।
এ সময়ে বহু সংখ্যক আরব মালাবারে গমন করেন। তারা প্রায়শই মালাবারের উপর দিয়ে চট্টগ্রাম এবং সেখান থেকে সিলেট কামরূপ হয়ে চীনের ক্যান্টন বন্দরে যাতায়াত করতেন।
সাহাবায়ে কেরামের চট্টগ্রাম সফরঃ
মহানবী (সা) এর জীবদ্দশায় ইসলাম প্রচারের নিমিত্তে সাহাবায়ে কেরামের (রা ) একটি দল হাবশা বা আবিসিনিয়ায় পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি হাবশার বাণিজ্য কেন্দ্রটিকে পূর্ণ মাত্রায় দ্বীন প্রচারে ব্যবহার করতেন।
সাহাবী হযরত সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. কিছু সংখ্যক হাবশী মুসলমানদের নিয়ে সম্রাট নাজ্জাশীর দেয়া একটি জাহাজে করে পূর্ব দিকে সমুদ্র পথে বের হন। তার সাথে ছিলেন সাহাবী হযরত কায়স ইবনে হুযাইফা রা. উরওয়া ইবনে আছাছা রা. আবু কায়স ইবনে হারিস রা. তাঁরা চীনের পথে রওয়ানা হন।
হযরত সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. ছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মানিতা মাতা হযরত আমেনা (রাঃ) এর আপন চাচাতো ভাই এবং জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী।
৬২৬ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম প্রচারকগণ চীনে অবতরণ করেন। তাদের নির্মিত কেয়াংটাং মসজিদ এবং মসজিদের অদূরেই হযরত আবি ওয়াক্কাসের কবর এখনো চীনা মুসলামানদের জিয়ারতগাহ। হযরত আবি ওয়াক্কাসের এ কাফেলা হাবশা হতে চীন আসতে নয় বছর সময় নেয়। পথিমধ্যে অনেক দেশে জাহাজ নোঙ্গর করে।
চট্টগ্রাম নিশ্চয় সেই তালিকা হতে বাদ পড়েনি। কারণ এটা জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ ট্রানজিট রুট।
‘মুসলিম জাহান’ পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাজা হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে (৬০৬-৬৪৩ খ্রিঃ) আরব দেশ হতে একটি ছোট্ট প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করতে আসেন। তাদের কাথাবার্তা, আচার-আচরণে মুগ্ধ হয়ে এই অঞ্চলের অধিবাসীগণ ব্যাপকহারে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ড. কে.এন ভট্টশালী আরাকানী রাজাদের ইতিহাস গ্রন্থ ‘রাত জা তু’এ এর নিম্নরূপ একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, “কানরা দজাগীর বংশীয় রাজা সত্য ইঙ্গত চন্দয়ত এর আমলে (৭৮৮-৮১০খ্রিঃ) আরকান উপকূলের রণবী দ্বীপের সংগে সংঘর্ষে কয়েকটি কুল বা বিদেশী জাহাজ বিধ্বস্ত হয়। রাজা জাহাজের মুসলিম আরোহীদের উদ্ধার করে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। এ বর্ণনা থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, যারা আরাকানে গিয়েছিলেন তাঁরা নিশ্চয় চট্টগ্রাম হয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৮৭ সালে লালমনির হাট জেলার মসতের পাড় মৌজায় একটি টিলা খননের সময় একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার হয়। যেখানে নির্মাণকাল উৎকীর্ণ ছিল ৬৯হিঃ। যারা লালমনির হাটে এসেছিলেন নিশ্চয় তাঁরা বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র পথেই এসেছিলেন।
আরবগণ দক্ষিণ চীন সাগর পাড়ি দিয়ে চীনের ক্যান্টন বন্দর, বর্তমান চট্টগ্রাম, প্রাচ্যের জাভা, সূমাত্রা প্রভৃতি বন্দরসমূহে বাণিজ্য করতেন। উপরোক্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে আল্লামা জয়নুদ্দীন তাঁর তুহফাতুল মুজাহেদীন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মুহাম্মদ (সা) এর যুগে চট্টগ্রামে ইসলাম আসে। হযরত শাহ জালাল রহ. সিলেট বিজয়ের সময় যে বুরহানুদ্দীন ছিলেন তিনি এই আরবদেরই বংশধর।
প্রখ্যাত গবেষক ড. হাসান জামান রচিত ও বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ‘সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য’ গ্রন্থে রাসূল (সা) এর যুগে এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের কথা নির্দ্বিধায় উল্লেখ করেছেন। মাওলানা আব্দুল হাই লৌক্ষভী স্বীয় গ্রন্থ নুযহাতুল খাওয়াতের ও মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. সহ উপমহাদেশের নামকরা ঐতিহাসিকগণ উপরোক্ত মতের সমর্থনে অনেক তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন।
প্রিয় পাঠক ও দ্বীনী ভায়েরা,
দাওয়াতে তাবলীগের কাজে সাহাবায়ে কেরামগন নিজেকে আল্লাহর পথে কিভাবে উৎসর্গ করেছিলেন তাদের এই ইতিহাসই সাক্ষী, তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বদৌলতে আজ আমরা নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছি, সাহাবায়ে কেরামগন তাদের সময় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্হা না থাকার পরও সুদূর আরব হতে চীন পর্যন্ত শান্তি ও মুক্তির ধর্ম ইসলাম পৌঁছে দিয়েছেন, কিন্তু আজ যোগাযোগ এত উন্নত হওয়ার পরও আমরা দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে কতটিকু এগিয়েছি???
শেয়ার করে দাওয়াতি কাজে শরীক হোন।
ছাঈদ কোদালাভী ২৪-১২-২০১৫ ইং
"চট্টগ্রাম" বিশ্বের সু-প্রাচীন জনপদ সমূহের একটি হিসেবে ঐতিহাসিক ও ভৌগলিকভাবে প্রমাণিত ও স্বীকৃত। এটা বাংলার বাবুল ইসলাম বা ইসলামের প্রবেশ দ্বার হিসাবে খ্যাত। এখানে তিন দিক দিয়ে ইসলামের আগমন ঘটে। প্রথমত: আরব বণিকগণের মাধ্যমে, দ্বিতীয়ত: হক্কানী পীর আউলিয়াদের মাধ্যমে, তৃতীয়ত: বিজেতাদের মাধ্যমে, এখানে উল্লেখিত প্রথম বিষয়টির উপর সংক্ষেপে আলোচনার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
আরব বণিকগণ :
আরব ছিলো খাদ্য ঘাটতির দেশ, তাদের বাধ্য হয়ে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বাইরে যেতে হতো। স্বয়ং রাসূল (সা) ও নিজেই এ রকম বেশ কয়েকটি কাফেলায় শরীক ছিলেন। তৎকালীন আমদানী রপ্তানী বাণিজ্যে আরবদের জুড়ি ছিলোনা। তাদের গ্রীষ্ম ও শীতকালীন বিদেশ যাত্রার কথা কুরআনে কারীমের সূরা কুরাইশে বর্ণিত হয়েছে।
আরব ভূ-খন্ড হচ্ছে একটি উপদ্বীপ। তার তিন দিকের স্থল ভাগের অধিকারী ছিল তৎকালীন দুই বৃহৎ পরাশক্তি রোম ও পারস্য, তাদের উপর দিয়ে বাণিজ্য পরিচালনা আরবদের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে সামুদ্রিক পথকে বেছে নিতে হয়। উজানের পানিতে কীভাবে জাহাজ চালাতে হয় এবং জোয়ার-ভাটায় জাহাজ চালানোর পদ্ধতি বিশ্ববাসী আরবদের থেকে শিখেছেন।
আরবদের এই নৌ বাণিজ্যের সময় বঙ্গোপসাগরে চট্টগাম বন্দর ছিল খুবই সুবিধাজক প্রোতাশ্রয়। আরবরা এখান থেকে সুগন্ধি ও মসল্লাজাত দ্রব্যাদি আমদানি করে ইউরোপের বাজারে বিক্রি করতো। আরবগণ যেমন তাদের বাণিজ্য জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে চষে বেড়াতো, ঠিক তেমনি চট্টগ্রামও তৎকালীন যুগে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি সম্পন্ন ছিলো। চট্টগ্রামের তৎকালীন যুগে নির্মিত জাহাজ অধ্যাবদি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। চট্টগ্রামের নাবিকগণও তাদের জাহাজ নিয়ে বহিঃসমুদ্রে গমন করতেন। ফলে আরবদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে।
আরবগণ মিশনারী জাতি। যেখানে যেতেন সেখানে বসতি গড়ে তুলতেন। এইভাবে ঐতিহাসিক দলিল ও দস্তাবেজের মাধ্যমে জানা যায় যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) এর আগমনের পূর্বেই চট্টগ্রামে আরব বসতি গড়ে উঠে।
এমনকি কর্ণফুলী নদীর নামটিও আরবদের দেয়া। আরবীতে করণফুল অর্থ লবঙ্গ। আরবদের লবঙ্গ ভর্তি একটি জাহাজ এই নদীতে নিমজ্জিত হয়েছিল বলেই এ নদীর নাম কর্ণফুলী।
আদি পিতার নাজিলের স্থান আর হিন্দের প্রতি আরবদের ঝোঁক বরাবরই ছিল। অধিকন্তু তৎকালীন জাহেলী যুগের আরব কবিদের কবিতায় আল হিন্দের কথা এসেছে। কাব ইবনে যোহায়ের ইবনে আবি সালমা যিনি ছিলেন এক আরব কবি এবং পরবর্তীতে আল্লাহর রাসুল (সা) এর একজন সাহাবি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ইসলাম গ্রহনের পূর্বে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে লিখতেন। পরবর্তীতে তওবা করেন এবং নিজেই ইসলাম গ্রহনের জন্য আল্লাহর রাসুল (সা) এর কাছে আসেন। যেদিন তিনি ইসলাম গ্রহন করলেন সেদিন তাঁর পাঠ করা কবিতাটির কয়েক লাইন ছিল এরকম-
আমি নিজের হাত অকপটে রেখেছি এমন এক ব্যক্তির হাতে,
যার রয়েছে প্রতিশোধ গ্রহনের পূর্ণ শক্তি এবং যার কথাই কিনা সবার উপরে।
আমাকে বলা হয়েছিল, তোমার নামে এরূপ অরূপ নালিশ রয়েছে আর তোমাকে করা হবে জিজ্ঞাসাবাদ।
অথচ নিশ্চয়ই রাসুল (সা) এমন এক নূর, যে নূর থেকে আলো পাওয়া যায়।
তিনি আল্লাহর তলোয়ার সমুহের মধ্যে একখানা হিন্দুস্তানি তলোয়ার।"
এই কবিতাটি আল্লাহর রাসুল (সা) এর জীবনী আর রাহিকুল মাখতুম সহ আরও অসংখ্য জায়গায় এসেছে। সেই সময়ে হিন্দ তথা হিন্দুস্তান তথা ভারত উপমহাদেশের অনেক প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ছিল প্রশংসনীয়। হিন্দের প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থার সুনামের কথাও ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। উপরোল্লেখিত ঐতিহাসিক প্রমাণাদি হতে বুঝা যায় চট্টগ্রাম ও আরব সম্পর্ক বহু প্রাচীন।
দ্রাবিড়দেরকে এ অঞ্চলের প্রাচীন জাতি হিসেবে ধরা হয়। আর্যরা হিন্দুদেরকে তাদের আদি নিবাস কাস্পিয়ান হ্রদ এলাকা হতে এদেশে নিয়ে আসে। এক পর্যায়ে হিন্দু পূনর্জাগরণবাদীদের আশুরিক শক্তির দাপটে জৈন ধর্ম বিলুপ্ত প্রায়, বৌদ্ধদের অবস্থা তথৈবচ। ঠিক এই সময় বাংলার সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে প্রচারিত হয়েছিল সত্য ও সাম্যের ধর্ম ইসলাম।
প্রখ্যাত গবেষক গোপাল হাওলাদার বলেন, “বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে রুষ্ট হয়ে ব্রাহ্মণদের শাস্তি দেয়ার জন্য দেবতা নিযুক্ত করলেন। আর এ দেবতা হচ্ছে মুসলমান।
ড. ইবনে গোলাম সামাদের মতে ইউরোপীয় বণিকদের মধ্যে পর্তুগীজরা সর্ব প্রথম বাংলায় আসেন। তারা ১৫১৭ সালে চট্টগ্রামে ঘাটি গড়ে তোলেন। পর্তুগীজদের লেখা থেকে আমরা এ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক উপাদান পাই। প্রখ্যাত পর্তুগীজ পর্যটক জোয়াওদ্য বারোজ লিখেছেন “পর্তুগীজদের চট্টগ্রামে আসার প্রায় একশত বছর পূর্বে একজন সম্ভ্রান্ত আরব যুবক তার একুশ অনুচরসহ দক্ষিণ আরবের এডেন বন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসেন। তিনি তার দীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা করেছেন।
চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে কিছু আরব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন, উঁচু গন্তাস্থি বক্র এক নাক এবং উপবৃহত্তকার সংকীর্ণ মুখন্ডল তাছাড়াও অনেকেই আরব উপাধি যেমন শেখ, সৈয়দ ইত্যাদি ধারণ করে। অনেক স্থানের নামের সাথেও আরবী নামের মিল পাওয়া যায়। শোলক বহর, বাকলিয়া, আল করন ইত্যাদি,
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় প্রচুর আরবী উপসর্গ বিদ্যমান। বিশেষ করে ক্রিয়া পদের পূর্বে ‘না’ সূচক শব্দ ব্যবহার আরবী প্রভাবের ফল যেমন " নখাইয়ুম নযাইয়ুম নপাইজ্জুম ইত্যাদী।
বহুকাল আগে বহু সংখ্যক আরবী বণিক ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতের মালাবা, কালিকট ইত্যাদি এলাকায় আগমনের কথা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। যেমন বর্ণিত আছে যে, মালাবায়ে চেরর রাজা চেরুমল পেরুমল সিংহাসনে আরোহণের বর্ষপূর্তিতে প্রাসাদের ছাদে উঠলে প্রত্যক্ষ করেন যে, চন্দ্র দ্বি-খন্ডিত হয়ে দুই টুকরা দুই পাহাড়ে পতিত হয়েছে। বিস্মিত রাজা পরে জানতে পারেন যে, আরবে এক নবীর উদ্ভব হয়েছে। অধিবাসিরা তাঁর মুজিজা দেখতে চাইলে তিনি চন্দ্র দ্বি-খন্ডিত করে দেখান। রাজা বিবরণ শুনে স্বয়ং আরবে গিয়ে ইসলাম গ্রহন করেন।
এ সময়ে বহু সংখ্যক আরব মালাবারে গমন করেন। তারা প্রায়শই মালাবারের উপর দিয়ে চট্টগ্রাম এবং সেখান থেকে সিলেট কামরূপ হয়ে চীনের ক্যান্টন বন্দরে যাতায়াত করতেন।
সাহাবায়ে কেরামের চট্টগ্রাম সফরঃ
মহানবী (সা) এর জীবদ্দশায় ইসলাম প্রচারের নিমিত্তে সাহাবায়ে কেরামের (রা ) একটি দল হাবশা বা আবিসিনিয়ায় পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি হাবশার বাণিজ্য কেন্দ্রটিকে পূর্ণ মাত্রায় দ্বীন প্রচারে ব্যবহার করতেন।
সাহাবী হযরত সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. কিছু সংখ্যক হাবশী মুসলমানদের নিয়ে সম্রাট নাজ্জাশীর দেয়া একটি জাহাজে করে পূর্ব দিকে সমুদ্র পথে বের হন। তার সাথে ছিলেন সাহাবী হযরত কায়স ইবনে হুযাইফা রা. উরওয়া ইবনে আছাছা রা. আবু কায়স ইবনে হারিস রা. তাঁরা চীনের পথে রওয়ানা হন।
হযরত সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. ছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মানিতা মাতা হযরত আমেনা (রাঃ) এর আপন চাচাতো ভাই এবং জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী।
৬২৬ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম প্রচারকগণ চীনে অবতরণ করেন। তাদের নির্মিত কেয়াংটাং মসজিদ এবং মসজিদের অদূরেই হযরত আবি ওয়াক্কাসের কবর এখনো চীনা মুসলামানদের জিয়ারতগাহ। হযরত আবি ওয়াক্কাসের এ কাফেলা হাবশা হতে চীন আসতে নয় বছর সময় নেয়। পথিমধ্যে অনেক দেশে জাহাজ নোঙ্গর করে।
চট্টগ্রাম নিশ্চয় সেই তালিকা হতে বাদ পড়েনি। কারণ এটা জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ ট্রানজিট রুট।
‘মুসলিম জাহান’ পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাজা হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে (৬০৬-৬৪৩ খ্রিঃ) আরব দেশ হতে একটি ছোট্ট প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করতে আসেন। তাদের কাথাবার্তা, আচার-আচরণে মুগ্ধ হয়ে এই অঞ্চলের অধিবাসীগণ ব্যাপকহারে ইসলাম গ্রহণ করেন।
ড. কে.এন ভট্টশালী আরাকানী রাজাদের ইতিহাস গ্রন্থ ‘রাত জা তু’এ এর নিম্নরূপ একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, “কানরা দজাগীর বংশীয় রাজা সত্য ইঙ্গত চন্দয়ত এর আমলে (৭৮৮-৮১০খ্রিঃ) আরকান উপকূলের রণবী দ্বীপের সংগে সংঘর্ষে কয়েকটি কুল বা বিদেশী জাহাজ বিধ্বস্ত হয়। রাজা জাহাজের মুসলিম আরোহীদের উদ্ধার করে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। এ বর্ণনা থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, যারা আরাকানে গিয়েছিলেন তাঁরা নিশ্চয় চট্টগ্রাম হয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৮৭ সালে লালমনির হাট জেলার মসতের পাড় মৌজায় একটি টিলা খননের সময় একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার হয়। যেখানে নির্মাণকাল উৎকীর্ণ ছিল ৬৯হিঃ। যারা লালমনির হাটে এসেছিলেন নিশ্চয় তাঁরা বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র পথেই এসেছিলেন।
আরবগণ দক্ষিণ চীন সাগর পাড়ি দিয়ে চীনের ক্যান্টন বন্দর, বর্তমান চট্টগ্রাম, প্রাচ্যের জাভা, সূমাত্রা প্রভৃতি বন্দরসমূহে বাণিজ্য করতেন। উপরোক্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে আল্লামা জয়নুদ্দীন তাঁর তুহফাতুল মুজাহেদীন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মুহাম্মদ (সা) এর যুগে চট্টগ্রামে ইসলাম আসে। হযরত শাহ জালাল রহ. সিলেট বিজয়ের সময় যে বুরহানুদ্দীন ছিলেন তিনি এই আরবদেরই বংশধর।
প্রখ্যাত গবেষক ড. হাসান জামান রচিত ও বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ‘সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য’ গ্রন্থে রাসূল (সা) এর যুগে এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের কথা নির্দ্বিধায় উল্লেখ করেছেন। মাওলানা আব্দুল হাই লৌক্ষভী স্বীয় গ্রন্থ নুযহাতুল খাওয়াতের ও মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ. সহ উপমহাদেশের নামকরা ঐতিহাসিকগণ উপরোক্ত মতের সমর্থনে অনেক তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন।
প্রিয় পাঠক ও দ্বীনী ভায়েরা,
দাওয়াতে তাবলীগের কাজে সাহাবায়ে কেরামগন নিজেকে আল্লাহর পথে কিভাবে উৎসর্গ করেছিলেন তাদের এই ইতিহাসই সাক্ষী, তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে বদৌলতে আজ আমরা নিজেকে মুসলিম বলে পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছি, সাহাবায়ে কেরামগন তাদের সময় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্হা না থাকার পরও সুদূর আরব হতে চীন পর্যন্ত শান্তি ও মুক্তির ধর্ম ইসলাম পৌঁছে দিয়েছেন, কিন্তু আজ যোগাযোগ এত উন্নত হওয়ার পরও আমরা দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে কতটিকু এগিয়েছি???
শেয়ার করে দাওয়াতি কাজে শরীক হোন।
ছাঈদ কোদালাভী ২৪-১২-২০১৫ ইং
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন